আমার সহ-নাগরিক,

নমস্কার!

২৬ নভেম্বর প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের কাছে অত্যন্ত গর্বের একটি দিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনেই গণ-পরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত হয় – যে পবিত্র নথি স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে দেশের বিকাশের অভিমুখ নির্ধারণ করে চলেছে। সেজন্যই, প্রায় এক দশক আগে, ২০১৫ সালে, এনডিএ সরকার ২৬ নভেম্বর দিনটিকে সংবিধান দিবস হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমাদের সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই সাধারণ এবং আর্থিক অসুবিধার মধ্যে থাকা এক পরিবার থেকে উঠে আসা আমার মতো একজন মানুষ ধারাবাহিকভাবে ২৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করে চলেছি। ২০১৪-র সেই সময়ের কথা মনে পড়ে, যখন আমি প্রথমবার সংসদে আসি এবং নতজানু হয়ে গণতন্ত্রের এই মহান মন্দিরের সোপান স্পর্শ করি। আবারও, ২০১৯-এ, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর, সংবিধান সদনের কেন্দ্রীয় কক্ষে প্রবেশ করার সময়ে, আমার কপালে সংবিধানের স্পর্শলাভ করি নতমস্তকে। এই সংবিধান আমার মতো আরও অনেককেই স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণের লক্ষ্যে কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে।

সংবিধান দিবসে আমরা গণ-পরিষদের সকল প্রেরণাদায়ী সদস্যদের স্মরণ করি। এই পরিষদের সভাপতিত্বে ছিলেন ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, যিনি সংবিধানের নির্মাণে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। আমরা স্মরণ করি ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রয়াসকে, যিনি অতুলনীয় দূরদর্শিতার সঙ্গে খসড়া কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। গণ-পরিষদের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মহিলা সদস্য সংবিধানকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের দূরদর্শী এবং সুচিন্তিত মতামত প্রদানের মাধ্যমে।

ফিরে যাই ২০১০ সালে। ঐ বছর ছিল ভারতের সংবিধানের ৬০ বছর পূর্তি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিষয়টি জাতীয় স্তরে যতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল, তা পায়নি। কিন্তু, সংবিধানের প্রতি সম্মিলিত সম্মান প্রদর্শন এবং দায়বদ্ধতার বোধ থেকে আমরা গুজরাটে ‘সংবিধান গৌরব যাত্রা’-র আয়োজন করেছিলাম। আমাদের সংবিধান স্থাপন করা হয়েছিল হস্তীপৃষ্ঠে এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু মানুষের সঙ্গে আমি ঐ পদযাত্রায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে নিজেকে সম্মানিত মনে করেছিলাম।

সংবিধানের ৭৫ বছর পূর্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে এটি হবে ভারতের মানুষের চেতনায় এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। সংসদের বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন করি আমরা এবং ঐ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের উদযাপনে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়। নজিরবিহীন সংখ্যায় মানুষ এই উদযাপনে সামিল হন।

এই বছরের সংবিধান দিবস নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

এই বছর দু’জন অসাধারণ মানুষের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং ভগবান বিরসা মুন্ডা। দু’জনেই আমাদের দেশের গৌরবময় যাত্রায় অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। সর্দার প্যাটেলের দূরদর্শী নেতৃত্ব ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য নিশ্চিত করেছে। তাঁর সাহসিকতা এবং প্রেরণাকে সামনে রেখেই আমরা ৩৭০ এবং ৩৫(এ) ধারার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হয়েছি। ভারতের সংবিধান এখন জম্মু ও কাশ্মীরে সম্পূর্ণভাবে প্রযোজ্য, যাতে প্রতিটি মানুষের, বিশেষত মহিলা এবং প্রান্তিকতম জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত হয়। ভগবান বিরসা মুন্ডার জীবন, জনজাতি গোষ্ঠীর ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করায় ভারতের কাছে প্রেরণার উৎস।
এই বছর আমরা বন্দে মাতরম-এর ১৫০তম বার্ষিকীও উদযাপন করছি, যে মন্ত্র যুগ যুগ ধরে ধ্বনিত হয়েছে ভারতীয় নাগরিকদের সম্মিলিত প্রতিজ্ঞার অনুরণনে জারিত হয়ে। একইসঙ্গে, আমরা শ্রী গুরু তেগ বাহাদুরজির ৩৫০তম আত্মবলিদান বার্ষিকী উদযাপন করছি, যাঁর জীবন ও ত্যাগ আমাদের কাছে সাহসিকতা, সংবেদনশীলতা এবং শক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

দেশমাতৃকার এই সন্তানরা এবং গুরুত্বপূর্ণ একের পর এক মাইলফলক আমাদের সচেতন করে তোলে নিজের কর্তব্যের বিষয়ে। সংবিধানে এই বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে ৫১(এ) ধারায় মৌলিক দায়িত্ব সম্পর্কিত অধ্যায়ে। সেখানে উল্লেখিত বিষয়গুলি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রগতির দিশায় সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায় আমাদের। মহাত্মা গান্ধী নাগরিকের কর্তব্যের বিষয়ে সচেতন করে দিয়েছেন আমাদের। তিনি বিশ্বাস করতেন, কর্তব্য পালন করলে তবেই অধিকারের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয় এবং প্রকৃত অধিকার কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়েই অর্জন করা সম্ভব।

এই শতকের সূচনার পর ২৫ বছর ইতিমধ্যেই অতিবাহিত। আরও দু’দশকের সামান্য কিছু বেশি সময় পর আমরা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির ১০০ বছর উদযাপন করব। ২০৪৯-এ সংবিধান গৃহীত হওয়ার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। আজ আমরা যে নীতি, যে সিদ্ধান্ত এবং সম্মিলিত কর্মপন্থা গ্রহণ করব, তা নির্ধারণ করে দেবে নবতর প্রজন্মের জীবন ও ভবিষ্যৎ।

এই অনুপ্ররণা নিয়েই আমরা বিকশিত ভারতের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলব, আমাদের মননে সর্বাগ্রে স্থান পাবে দেশের প্রতি কর্তব্যের দায়বদ্ধতা।

আমাদের দেশ যে অতুলনীয় ঐশ্বর্য আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে, তা অন্তরের গহনতম স্তরে থেকে কৃতজ্ঞতার বোধ জাগিয়ে তোলে এবং এই অনুভূতি আমাদের চেতনার সঙ্গে কর্তব্য সম্পাদনের স্পৃহাকে সম্পৃক্ত করে দেয়। কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, প্রতিটি কর্মের সম্পাদনে ঐকান্তিক প্রয়াস বজায় রাখা। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করবে আমাদের সংবিধানকে এবং জাতীয় লক্ষ্য ও স্বার্থ পূরণের যাত্রা হবে ত্বরান্বিত। সংবিধান প্রণেতাদের স্বপ্ন পূরণ আমাদের দায়িত্ব। এই দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এগোলে দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রগতিযাত্রার গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

আমাদের সংবিধান নাগরিকদের ভোটাধিকার দিয়েছে। সাবালক নাগরিক হিসেবে জাতীয়, প্রাদেশিক এবং স্থানীয় নির্বাচনে এই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ হাতছাড়া না হতে দেওয়া আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমরা প্রতি বছর ২৬ নভেম্বর দিনটিতে ১৮ বছর বয়ঃপ্রাপ্তদের সচেতন করে তোলার জন্য বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি। তেমনটা হলে প্রথমবারের ভোটাররা এই বোধে জারিত হবে যে তারা নিছক শিক্ষার্থীর সীমা ছাড়িয়ে দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠেছে।

আমাদের যুব প্রজন্মকে কর্তব্যবোধ এবং দেশের প্রতি গর্বের চেতনায় পূর্ণ করলে তারা আজীবন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। এই বোধ শক্তিশালী দেশ গঠনের ভিত্তি।

সংবিধান দিবসে এই গৌরবময় দেশের নাগরিক হিসেবে কর্তব্য সম্পাদনে আরও একবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই সকলে। তবেই আমরা উন্নত ও শক্তিশালী বিকশিত ভারত নির্মাণে অর্থপূর্ণ অবদান রাখতে পারব।
আপনাদের,

নরেন্দ্র মোদী

Explore More
শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ

জনপ্রিয় ভাষণ

শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ
PM Modi Lauds PV Sindhu For Japan Open, Women's Cricket Team On Lord's Win

Media Coverage

PM Modi Lauds PV Sindhu For Japan Open, Women's Cricket Team On Lord's Win
NM on the go

Nm on the go

Always be the first to hear from the PM. Get the App Now!
...
ভারতের ঐক্য ও অগ্রগতির জন্য নিবেদিত একটি জীবন
July 06, 2026

আজ, ৬ই জুলাই, সেই অগণিত মানুষের জন্য একটি বিশেষ দিন যারা জাতীয়তাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শকে লালন করেন। আমরা ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করছি; তাঁর জীবন 'ভারতমাতা'-র প্রতি অটল নিষ্ঠা ও সাহসিকতার এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আধুনিক ভারতের খুব কম নেতাই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো মেধা, জনসেবা এবং নৈতিক দৃঢ়তার এমন এক অপূর্ব ও গভীর সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক হতে পেরেছিলেন।

তরুণ শ্যামাপ্রসাদ এমন এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা সহজেই তাঁকে একটি সুরক্ষিত ও আরামদায়ক জীবন এনে দিতে পারত। তাঁর পিতা, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ছিলেন তৎকালীন যুগের অন্যতম প্রধান শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী। অথচ, ভাগ্য যখন তাঁর সামনে সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ জীবনের পথ উন্মুক্ত করেছিল, তখন তাঁর বিবেক তাঁকে ত্যাগ ও দেশসেবার পথে চালিত করেছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ঔপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক সংকটের মতো সমসাময়িক অস্থিরতার সময়ে তিনি কেবল নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারেন না। এই যাত্রাপথে তাঁকে গভীর ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হতে হয়েছিল - যার মধ্যে ছিল নিজের শিশুপুত্র ও পরবর্তীকালে স্ত্রীর অকালপ্রয়াণ। তবুও, এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কেবল তাঁর সংকল্পকে আরও দৃঢ় এবং সেবার প্রতি তাঁর অটল নিষ্ঠাকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনজীবনকে যদি কোনো একটি আদর্শ সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে থাকে, তবে তা হলো ভারতের অখণ্ডতা। দেশভাগের চরম অস্থিরতার সময়েও তিনি অবিচল ছিলেন যাতে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে থাকে। কয়েক বছর পর, সেই একই দৃঢ় বিশ্বাস তাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে ধাবিত করেছিল। কারাবাস তাঁকে দমাতে পারেনি এবং নিঃসঙ্গতাও তাঁর মনোবল কমাতে পারেনি। বন্দিদশাতেই তাঁর জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে - সেই অগণিত মানুষের থেকে বহু দূরে, যাদের স্বার্থরক্ষাকে তিনি নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত আত্মত্যাগ রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ডঃ মুখোপাধ্যায়ের শেষ যাত্রাও ছিল তেমনই এক মুহূর্ত। আচার্য বিনোবা ভাবে বলেছিলেন যে, ডঃ মুখোপাধ্যায় এমন এক আদর্শের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন যার ওপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল। বহু বছর পর, ২০১৯ সালে ৩৭০ ও ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ রদ করার বিষয়টি ছিল তাঁর সেই আত্মবলিদানের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ড. মুখার্জি সর্বদা ভারত ও ভারতীয় মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এবং ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তা করেছিলেন, যা তৎকালীন প্রথাগত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হয়েছিলেন। নিজস্ব অনন্য শৈলীতে তিনি এমন সব ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন যা ছিল দেশপ্রেমমূলক ও দূরদর্শী। শিক্ষাবিদদের এক সম্মেলনে ভাষণদানকালে ড. মুখার্জি চমৎকারভাবে বলেছিলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সম্ভাব্য করণিক বা স্বল্প বেতনের কর্মী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখা ভুল। আমাদের এমন সব শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে হবে যারা আমাদের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান - যেমন পৌরসভা, প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভা - পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে; পাশাপাশি যারা জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্র - যেমন অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প - পরিচালনার দায়িত্বও নিতে পারবে।”

তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছু অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গ্রন্থাগারের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার প্রসার, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা শিল্পকর্মের অধ্যয়নে উৎসাহ প্রদান এবং কৃষি বিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু করা। তিনি খেলাধুলা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রকল্যাণের মতো বিষয়গুলোর প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ববোধ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি ২৪ জানুয়ারি তারিখটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে পালন করার প্রথা চালু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গান রচনার অনুরোধ নিয়ে তিনি স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

তাঁর এই মানসিকতার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে, যখন তিনি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এমন এক সময়ে যখন কংগ্রেস দলের সর্বব্যাপী প্রভাব ছিল, তখন তিনি অনুভব করেছিলেন যে ভারতের অগ্রগতির পক্ষে কথা বলার জন্য এবং একই সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার জন্য একটি বিকল্প কণ্ঠস্বরের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। দলের প্রতীক হিসেবে মাটির প্রদীপ বা ‘দিয়া’-কে বেছে নেওয়াটা সম্ভবত অত্যন্ত যথার্থ ছিল। একটি প্রদীপ হয়তো দেখতে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু তার চারপাশের অনেক দূর পর্যন্ত অন্ধকার দূর করার ক্ষমতা তার থাকে। সক্রিয় থাকাকালীন সময়ে এবং তার পরেও জনসংঘ ঠিক এই কাজটিই করেছিল।

ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কার্যকাল এমন এক রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় তুলে ধরে, যার উন্নয়ন-ভাবনা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও মানবিক। তিনি শিল্পকে নবীন স্বাধীন একটি জাতির মর্যাদা, সুযোগ ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি সম্পদ সৃষ্টি এবং মূল্য সংযোজনের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতেন। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন ও সিন্দ্রি সার কারখানার মতো অগ্রগামী উদ্যোগ এবং একটি বলিষ্ঠ শিল্পনীতির মাধ্যমে আধুনিক শিল্প-ভারতের ভিত্তি স্থাপনের পাশাপাশি, তিনি এটাও নিশ্চিত করেছিলেন যেন ভারতের ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলো অবহেলিত না হয়। তাঁতশিল্প, কুটির শিল্প, কারিগর এবং বস্ত্রশিল্পের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক।

এখানে আমি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। আত্মনির্ভরশীলতার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ড. মুখার্জি যে সিন্দ্রি কারখানাটি গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছিলেন, পরবর্তী কয়েক দশক ধরে যারা দেশ পরিচালনা করেছেন, তাঁরা সেটিকে উপেক্ষা করেছিলেন। আমি গর্বিত যে, আমাদের সরকার এই কারখানাটির পুনরুজ্জীবনে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছে। সেই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে পারাটা সত্যিই অত্যন্ত বিশেষ একটি মুহূর্ত ছিল।

ভারতের সভ্যতার ঐতিহ্যে দীর্ঘকাল ধরেই আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড. মুখার্জি এই গণতান্ত্রিক চেতনারই মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তিনি পণ্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন এই বিশ্বাস থেকে যে, স্বাধীনতার পরবর্তী প্রাথমিক বছরগুলোতে জাতি গঠনের কাজ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে। তিনি নিষ্ঠা ও গঠনমূলক মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি অনুভব করলেন যে জাতীয় স্বার্থে ভিন্ন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তখন তিনি মর্যাদার সঙ্গে পদত্যাগ করেন এবং নিজেকে সেই রাজনৈতিক কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন যা তিনি দেশের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতেন।

৭৫ বছর আগে পণ্ডিত নেহরু সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এনেছিলেন, যা ছিল বাক-স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। ড. মুখার্জি ছিলেন এর অন্যতম কঠোর সমালোচক। কংগ্রেস কী করতে সক্ষম, তা তিনি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন। এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। যারা ৭৫ বছর আগে প্রথম সংশোধনী এনেছিল, তারাই ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল এবং ৫০ বছর আগে ৪২তম সংশোধনী আইন এনেছিল - যা আবারও উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মূলে আঘাত হেনেছিল।

মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও ড. মুখার্জি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ড. মুখার্জি দুর্গত মানুষের সেবায় নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের অন্নসংস্থানের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি ক্যান্টিন ও ত্রাণ কেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিকে যেমন তিনি তাঁর দেশের মানুষের দুর্দশা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসকদের অসংবেদনশীলতা তাঁকে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছিল। তিনি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তাঁর সেই গভীর বেদনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরে যখন এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

কলকাতার একটি কলেজে ভাষণ দেওয়ার সময় ড. মুখার্জি তরুণদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “তোমরা যে কাজই হাতে নাও না কেন, তা অত্যন্ত গুরুত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং ভালোভাবে সম্পন্ন করো; কোনো কাজই কখনো অসম্পূর্ণ বা অসমাপ্ত রেখো না। যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের সেরাটা দিয়ে কাজ শেষ করছ, ততক্ষণ কখনোই সন্তুষ্ট হয়ো না।” ভারত যখন ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদনের উপায় হলো - এমন এক শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল ভারত গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন সচেষ্ট হওয়া, যার ওপর তিনি গভীর আস্থা রাখতেন। আর আজকের তরুণ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করলে আমি নিশ্চিত যে, তারা এই গুরুদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে এবং ঠিক সেটাই করবে।