শেয়ার
 
Comments

সারা বিশ্ব জুড়ে নীতি নির্ধারণের বিষয়ে কোভিড-১৯ মহামারী বিভিন্ন সরকারের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। স্থিতিশীল উন্নয়ন বজায় রেখে জনকল্যাণমূলক কাজে প্রচুর অর্থ সম্পদের যোগান দেওয়া সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

এই আবহে বিশ্ব জুড়ে আর্থিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আপনারা কি জানেন, ভারতের রাজ্যগুলি ২০২০-২১ সালে যথেষ্ট পরিমান অর্থ ঋণ নিতে পেরেছে? আপনারা অনেকেই শুনে অবাক হবেন, ২০২০-২১ সালে রাজ্যগুলি ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ নিতে পেরেছে। কেন্দ্র-রাজ্য অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাড়তি সম্পদের যোগান দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারীর আবহে আমরা যখন আর্থিক বিষয়গুলি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিলাম, তখন যে বিষয়ের কথা আমরা বিশেষভাবে বিবেচনা করেছি সেটি হল, একই সূত্র সব এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে না। একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যেখানে উপমহাদেশের ছোঁয়া রয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে জাতীয় স্তরে নীতি নির্ধারণ করে রাজ্য সরকারগুলি সংস্কারকে এগিয়ে নিয়ে যাবে – এটা প্রকৃতই একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। কিন্তু আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপ্তির প্রতি আস্থা ছিল আর আমরা কেন্দ্র – রাজ্য অংশীদারিত্বের ভাবনায় বিশ্বাসী।

আত্মনির্ভর ভারত প্যাকেজে ২০২০-র মে মাসে কেন্দ্র ২০২০-২১ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলি যাতে অতিরিক্ত ঋণ নিতে পারে সেই সংক্রান্ত ঘোষণা করেছিল। রাজ্যগুলি রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২ শতাংশ পরিমান অর্থ অতিরিক্ত ঋণ হিসেবে নিতে পারবে। এর মধ্যে ১ শতাংশ অর্থ শর্তসাপেক্ষে নেওয়া যাবে। কিছু নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার রূপায়ণ করলে রাজ্যগুলি ওই অতিরিক্ত অর্থ পাবে। ভারতীয় অর্থ ব্যবস্থায় এ ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ বিরল। রাজ্যগুলি যাতে প্রগতিশীল নীতি অবলম্বন করে বাড়তি তহবিলের সুবিধা পায়, এর মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। ফল হিসেবে দেখা গেছে, উন্নত আর্থিক নীতির মাধ্যমে যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক সংস্কার বাস্তবায়িত হয়েছে।

অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের যে ১ শতাংশ পরিমান অর্থ সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, সেটিকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রত্যেক ভাগে ০.২৫ শতাংশ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সমতুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়। প্রথম যে সংস্কারটি হাতে নেওয়া হয় তার মাধ্যমে সহজভাবে জীবনযাত্রার দিকটি নিশ্চিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ অংশের দরিদ্র মানুষেরা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথা ভাবা হয়েছে, তাঁদের আর্থিক স্থিতিশীলতার দিকটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমে ‘এক দেশ এক রেশন কার্ড’ ব্যবস্থাকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় সব রেশন কার্ডকে আধারের সঙ্গে সংযুক্তিকরণের নীতির বাস্তবায়ন রাজ্য সরকারগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে । পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের আধারের সঙ্গে রেশন কার্ডকে যুক্ত করার ফলে ন্যায্যমূল্যের রেশন দোকানে বৈদ্যুতিন পয়েন্ট অফ সেল মেশিনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলবে। এই পদ্ধতিতে সবথেকে উপকৃত হবেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। তাঁরা দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে রেশন সংগ্রহ করতে পারবেন। নাগরিকরা যেমন এর সুফল পেয়েছেন, পাশাপাশি ভুয়ো রেশন কার্ডের সমস্যা থেকেও বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ১৭টি রাজ্য এই সংস্কার সম্পূর্ণ করার ফলে ৩৭,৬০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ঋণ নিতে পেরেছে।

সহজে ব্যবসা করার জন্য দ্বিতীয় সংস্কারটি হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যগুলিকে ব্যবসা সংক্রান্ত লাইসেন্সের পুনর্নবীকরণের জন্য স্বয়ংক্রিয়, অনলাইন এবং বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ইন্সপেকশনের কাজ পুরোপুরি কম্পিউটারের মাধ্যমে করা হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা অহেতুক হয়রানি থেকে রেহাই পেয়েছেন এবং দুর্নীতি রোধ করা গেছে। এই সংস্কারের ফলে মূলত অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগীরা উপকৃত হয়েছেন। তাঁরা ইন্সপেক্টর রাজের সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। নতুন ব্যবস্থার ফলে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের উন্নত পরিবেশ গড়ে উঠেছে, আরও বেশি করে বিনিয়োগ হয়েছে, যার ফলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। ২০টি রাজ্য এই সংস্কার বাস্তবায়িত করার ফলে ৩৯,৫২১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণ পেয়েছে।

পঞ্চদশ অর্থ কমিশন এবং বিভিন্ন শিক্ষাবিদ যথাযথভাবে সম্পত্তি কর আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তৃতীয় সংস্কারটি ছিল সম্পত্তি কর এবং জল ও নিকাশি কর সংক্রান্ত। স্ট্যাম্প ডিউটির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজার দাম বিবেচনা করে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। মূলত শহরাঞ্চলে এই কাজ করা হয়। এর ফলে, শহরাঞ্চলের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ আরও ভালো পরিষেবা পাচ্ছেন, উন্নত পরিকাঠামো ও উন্নয়নে গতি আসছে। সম্পত্তি করের সংস্কারের ফলে শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ সবথেকে বেশি উপকৃত হচ্ছেন। এছাড়াও, পুরসভাগুলির কর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ে বেতন পাচ্ছেন – আগে তাঁদের মাসের পর মাস বেতনের জন্য অপেক্ষা করতে হত। ১১টি রাজ্য এই সংস্কারকে বাস্তবায়িত করায় অতিরিক্ত ১৫,৯৫৩ কোটি টাকা ঋণ নিতে পেরেছে।

প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর হল চতুর্থ সংস্কার। কৃষকরা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার পরিবর্তে এখন রাজ্যভিত্তিক প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেক রাজ্যের একটি জেলায় এ বছরের শেষের মধ্যে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সেটি বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে রাজ্যগুলির মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ০.১৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার সংস্থান থাকছে। কারিগরি ও বাণিজ্যিক ক্ষতির পরিমাণ কমানোর জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, রাজস্ব ও উৎপাদনের জন্য ব্যয়ের তফাৎ হ্রাস করতে পারলে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ০.০৫ শতাংশ হারে বাড়তি ঋণ পাওয়া যাবে। এর ফলে, বন্টন সংস্থাগুলি আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়েছে। এছাড়াও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হয়েছে যার মাধ্যমে পরিষেবার মানোন্নয়ন ঘটেছে। ১৩টি রাজ্য কমপক্ষে একটি উপাদানকে বাস্তবায়িত করেছে আর ছয়টি রাজ্য প্রত্যক্ষ তহবিল হস্তান্তর প্রক্রিয়াটির কাজ সম্পূর্ণ করেছে। এর ফলে, অতিরিক্ত ১৩,২০১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।

মোট ২ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ২৩টি রাজ্য ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়েছে। এর ফলে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে শর্তহীন এবং শর্তযুক্তভাবে ঋণ নেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। এই পরিমাণ রাজ্যগুলির মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪.৫ শতাংশ।

আমাদের মতো বিরাট দেশে বিভিন্ন সঙ্কট দেখা দেয়। এই অভিজ্ঞতাগুলিও নতুন। আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, বিভিন্ন প্রকল্প এবং সংস্কার বছরের পর বছর কার্যকর হয়নি। বর্তমানে অতীতের সেই অচল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। রাজ্যগুলি এবং কেন্দ্র অতীতে জনমুখী সংস্কারকে বাস্তবায়িত করার জন্য বিভিন্ন পন্থাপদ্ধতি অবলম্বন করত। কিন্তু বর্তমানে মহামারীর সময়ে স্বল্পকালের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস’-এর মন্ত্রের কারণে এটি রূপায়িত হয়েছে। আধিকারিকরা এই সংস্কারগুলি নিয়ে কাজ করার সময় বলেছিলেন অতিরিক্ত তহবিলের বিষয়ে উৎসাহিত না করলে এই নীতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য বছরের পর বছর লেগে যাবে। ভারত বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিঃশব্দে সংস্কারের যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে সেটি হল আস্থা ও উৎসাহের মাধ্যমে সংস্কারের নতুন একটি মডেল। আমি সমস্ত রাজ্যের কাছে কৃতজ্ঞ কারণ , তারা কঠিন এই সময়ের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট নীতিগুলিকে বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগী হয়েছে যাতে নাগরিকদের মঙ্গল হয়। ১৩০ কোটি ভারতবাসীর দ্রুত উন্নয়নের জন্য আমাদের একযোগে কাজ করার ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

২০ বছরের সেবা ও সমর্পণের ২০টি ছবি
Mann KI Baat Quiz
Explore More
জম্মু ও কাশ্মীরে নওশেরায় দীপাবলী উপলক্ষে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়ের মূল অংশ

জনপ্রিয় ভাষণ

জম্মু ও কাশ্মীরে নওশেরায় দীপাবলী উপলক্ষে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়ের মূল অংশ
India achieves 40% non-fossil capacity in November

Media Coverage

India achieves 40% non-fossil capacity in November
...

Nm on the go

Always be the first to hear from the PM. Get the App Now!
...
১০০ কোটি কোভিড টিকাকরণের পরিসংখ্যান বলছে যে মানুষের অংশগ্রহণ কী অর্জন করতে পারে
October 22, 2021
শেয়ার
 
Comments

২১ অক্টোবর, ২০২১। ভারত ১০০ কোটি ডোজ টিকাকরণ সম্পন্ন করল। টিকাকরণ কর্মসূচি শুরুর মাত্র ন’মাসের মধ্যেই এল এই সাফল্য। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এ এক দুরূহ যাত্রা! বিশেষত ২০২০ সালের গোড়ার দিকে কী পরিস্থিতি ছিল, তা ফিরে দেখলেই আমরা বুঝতে পারব। ১০০ বছর বাদে মানব সমাজ আরও এক অতিমারির কবলে। এবং কেউ বিশেষ কিছু জানতও না এই ভাইরাস সম্পর্কে। মনে পড়ে, কেমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়! দ্রুত চরিত্র বদল করা এক অজানা, অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা।
সেই আশঙ্কা থেকে আশ্বাসের পথে যাত্রার সূচনা হল। ক্রমে বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানের সুবাদে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল আমাদের দেশ।
সমাজের একাধিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে এটা সত্যিই ভগীরথের মতো এক প্রয়াস। চেষ্টার মাত্রাটা বুঝতে গেলে একটা ছোট্ট তথ্য জেনে রাখা দরকার। প্রতিটি টিকা দিতে একজন স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীর সময় লাগে ২ মিনিট। সেই অনুযায়ী এই সাফল্যে পৌঁছতে লেগেছে প্রায় ৪১ লক্ষ মানব-দিবস অথবা আনুমানিক ১১ হাজার মানব-বর্ষের চেষ্টা।
বড় মাত্রার যে কোন প্রয়াসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে হলে সবার আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এই অভিযানের সাফল্যের অন্যতম কারণ সেটাই। এই টিকাকরণ এবং তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা রেখেছে মানুষ। যদিও অনাস্থা এবং আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা কম হয়নি।
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুমাত্র বিদেশি ব্র্যান্ডে আস্থা রাখেন। এমনকী সেটা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রেও। তবে, কোভিড-১৯ টিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতবাসী সর্বসম্মতিক্রমে আস্থা রেখেছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ভ্যাকসিনের উপর। এটা এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
নাগরিক এবং সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে জন ভাগিদারীর আদর্শকে সামনে রেখে এক হয়ে যায়, তাহলে ভারত যে কী করতে পারে এই টিকাকরণ অভিযান তার একটি উদাহরণ। ভারত যখন টিকাকরণ অভিযান শুরু করে, তখন অনেকেই ১৩০ কোটি মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কেউ বলেছিলেন, তিন-চার বছর সময় লাগবে ভারতের। কারও কারও দাবি ছিল, মানুষ টিকা নিতে এগিয়ে আসবেন না। এমনও অনেকে ছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন, গোটা বিষয়টি অব্যবস্থার চূড়ান্ত হবে এবং টিকাকরণ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এমনকী কেউ কেউ তো এও বলেছিলেন যে, ভারত সরবরাহ শৃঙ্খল অটুট রাখতে পারবে না। কিন্তু জনতা কারফিউ এবং তার পরবর্তী লকডাউনের মতোই ভারতবাসী দেখিয়ে দিয়েছে, তাঁদের আস্থাভাজন অংশীদার করে তোলা গেলে কী অভাবনীয় ফলই না হতে পারে।
যখন সকলে এগিয়ে আসেন, তখন অসম্ভব বলে কিছুই থাকে না। আমাদের স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীরা পাহাড়ে চড়ে, নদী পেরিয়ে দুর্গম জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন মানুষকে টিকা দিতে। ভারতে টিকা নিয়ে অনাগ্রহীর সংখ্যা ছিল বেশ কম, যা অনেক উন্নত দেশেও দেখা যায়নি। তার জন্য আমাদের যুব সমাজ, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মী, সামাজিক এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রত্যেকেরই অভিনন্দন প্রাপ্য।
টিকাকরণ অভিযানে অগ্রাধিকার চেয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিভিন্ন রকম চাপ ছিল। কিন্তু সরকার এটা নিশ্চিত করেছে যে, অন্য অনেক কর্মসূচির মতো টিকাকরণ অভিযানেও কোন ভিআইপি সংস্কৃতি থাকবে না।
২০২০-র গোড়ায় যখন কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তখন থেকেই আমাদের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে, টিকার সাহায্য নিয়ে এই অতিমারির মোকাবিলা করতে হবে। সেইমতো আমরা প্রস্তুতি শুরু করে দিই। বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী গঠন করি। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকেই একটি রোডম্যাপ সাজিয়ে ফেলি।
আজ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি দেশই নিজেরা টিকা তৈরি করতে পেরেছে। ১৮০টিরও বেশি রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে কয়েকটি মাত্র উৎপাদকের ওপরেই নির্ভরশীল। বেশ কিছু দেশ এখনও টিকা হতে পাওয়ার অপেক্ষায়। সেখানে ভারত ১০০ কোটি ডোজের মাত্রা অতিক্রম করে গিয়েছে! একবার পরিস্থিতিটা ভাবুন—যদি ভারতের নিজস্ব টিকা না থাকত, তাহলে ভারত কীভাবে এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করত? এবং তার জন্য কত বছর সময় লাগত? এখানেই অভিনন্দন জানাতে হয় ভারতীয় বিজ্ঞানী এবং উদ্যোগপতিদের, যাঁরা সময়মতো এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের প্রতিভা এবং কঠোর পরিশ্রমের জন্যই আজ টিকার ক্ষেত্রে ভারত সত্যিকারের আত্মনির্ভর হয়ে উঠেছে। আমাদের টিকা নির্মাতারা এই বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে উৎপাদনও বাড়িয়েছেন, যার থেকে প্রমাণ হয়েছে যে তারা অদ্বিতীয়।
যে দেশে সরকারকে সাধারণত এগিয়ে চলার পথে বাধা হিসেবে ধরা হয়, সেখানে আমাদের সরকার প্রগতিকে গতি দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে। প্রথম দিন থেকেই টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে থেকেছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থদানের পাশাপাশি বিধিনিয়ম প্রক্রিয়ার গতি এনে সাহায্য করেছে। সরকারের সব মন্ত্রক একসঙ্গে টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অপসারণ করা হয়েছে যে কোনও বাধা। ভারতের মতো বিশাল দেশে শুধু টিকা প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। নজর দিতে হয়েছে শেষ বিন্দু পর্যন্ত তা পৌঁছনো এবং বাধাহীন লজিস্টিকসের উপর। যে সমস্যাগুলি ছিল, তা বুঝতে হলে ভ্যাকসিনের একটি ভায়ালের যাত্রার কথাটা ভাবুন। পুনে অথবা হায়দরাবাদের একটি কারখানা থেকে ভায়াল পাঠানো হয় যে কোনও রাজ্যের একটি হাবে। সেখানে থেকে সেটি জেলার হাবে যায়। সেই হাব থেকে তা পৌঁছে দেওয়া হয় টিকাকরণ কেন্দ্রে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিমান অথবা ট্রেনে কয়েক হাজার ট্রিপ। এই সম্পূর্ণ যাত্রাপথে টিকার ভায়াল একটি নির্দিষ্টমাত্রায় তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যা কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধানে থাকে। এর জন্য ১ লক্ষের বেশি কোল্ডচেন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। আগেভাগেই টিকা সরবরাহের সূচি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকেও। যাতে তারা ভালোভাবে সব পরিকল্পনা করতে পারেন এবং টিকাও পূর্বনির্ধারিত দিনেই তাদের কাছে পৌঁছয়। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব প্রয়াস।
এই সমস্ত প্রয়াসকে সাহায্য করেছে কো-উইনের মতো একটি শক্তিশালী টেক প্ল্যাটফর্ম। টিকাকরণ অভিযান যাতে সুষ্ঠু ও সঠিক মাত্রায় হয়, যাতে নজর রাখা যায় এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকে—তা নিশ্চিত করেছে কো-উইন। এর ফলে স্বজনপোষণ বা লাইন ভেঙে আগেভাগে যাওয়ার কোন জায়গাই ছিল না। একজন গরিব শ্রমিক নিজের গ্রামে প্রথম ডোজটি নিলেও নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে যাতে শহরের কর্মস্থলে এসে দ্বিতীয় ডোজটি নিতে পারেন, সেটাও নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বচ্ছতা বাড়াতে রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ডের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে কিউআর কোড দেওয়া সার্টিফিকেট। যাতে পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চয়তা মেলে। এই ধরণের প্রয়াসের নজির শুধু ভারতেই নয়, সারা বিশ্বে বিরল।
২০১৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে আমি বলেছিলাম যে, আমাদের দেশ সামনের দিকে এগচ্ছে ‘টিম ইন্ডিয়া’-র জন্য। এই ‘টিম ইন্ডিয়া’ আমাদের ১৩০ কোটি মানুষের একটি বড় দল। মানুষের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যদি ১৩০ কোটি ভারতীয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ চালাই, তাহলে দেশ প্রতি মুহূর্তে ১৩০ কোটি পা এগিয়ে যাবে। আমাদের টিকাকরণ অভিযান আরও একবার দেখাল এই ‘টিম ইন্ডিয়া’-র ক্ষমতা। টিকা কর্মসূচিতে ভারতের সাফল্য সারা বিশ্বকে এও দেখাল যে, ‘গণতন্ত্র করে দেখাতে পারে’!
বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে, তা আমাদের যুব সমাজ, উদ্ভাবক এবং সরকারের সব স্তরকে জনপরিষেবায় নতুন মাত্রা পৌঁছতে উৎসাহিত করবে বলেই আমি আশাবাদী। আর সেটা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠবে একটি মডেল।