কয়েক দিন আগেই আমরা হারিয়েছি প্রফেসর এম এস স্বামীনাথনকে। চলে গেলেন এমন একজন, যিনি কৃষি বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, দেশের বিকাশে যাঁর অবদান সব সময়ে লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। দেশপ্রেমিক প্রফেসর এম এস স্বামীনাথন চাইতেন ভারতের মানুষ, বিশেষত কৃষকরা সমৃদ্ধ জীবনযাপন করুন। লেখাপড়ায় কৃতি এই বিজ্ঞানী অন্য পেশাকেও বেছে নিতেই পারতেন। কিন্তু বাংলায় ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করে যে তিনি ঠিক করে ফেলেন কাজ করবেন কৃষিক্ষেত্র নিয়েই।

বেশ অল্প বয়সে তিনি ডঃ নরম্যান বোরলগের সংস্পর্শে আসেন। বিশদে ডঃ বোরলগের কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেন তিনি। ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতার কাজ পেয়েও ছেড়ে দেন ডঃ স্বামীনাথন। কারণ তিনি ভারতেই থেকে ভারতের জন্য কাজ করতে চাইছিলেন।

চরম সংকটের মধ্যে থাকা দেশকে তিনি যেভাবে স্বনির্ভরতা এবং প্রত্যয়ের দিশায় এগিয়ে নিয়ে গেছেন তা একবার ভেবে দেখুন। স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশক দেশের সামনে থাকা বড় সমস্যাগুলির মধ্যে ছিল খাদ্য ঘাটতি। ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে দুর্ভিক্ষের করাল ভ্রুকুটির মুখোমুখি হয় দেশ। ঠিক তখনই প্রফেসর স্বামীনাথনের দৃঢ় প্রত্যয়, দায়বদ্ধতা এবং দূরদর্শিতা দেশকে কৃষিক্ষেত্রে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর নেতৃস্থানীয় ভূমিকা সামগ্রিকভাবে কৃষিক্ষেত্র, বিশেষত গম উৎপাদনের প্রশ্নে দেশকে দারুনভাবে সফল করে তোলে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে এক্ষেত্রে স্বনির্ভর দেশ হয়ে ওঠে ভারত। স্বাভাবিকভাবেই “ভারতীয় সবুজ বিপ্লবের জনক” বলে চিহ্নিত হন ডঃ স্বামীনাথন।

সবুজ বিপ্লব ভারতের “সফল হবই” মনোভাবকে তুলে ধরে- অর্থাৎ সামনে যদি কোটি কোটি সমস্যা এসে উপস্থিত হয়, তবে তার মোকাবিলার জন্য আমাদের কাছেও রয়েছে উদ্ভাবনী শক্তিতে প্রজ্বলিত মনন। সবুজ বিপ্লব শুরু হওয়ার ৫ দশক পর ভারতীয় কৃষি আরও আধুনিক ও প্রগতিশীল হয়ে উঠেছে। তবে এর মূল ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন প্রফেসর স্বামীনাথন- একথা কখনই ভোলার নয়।

বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি আলু চাষে পরজীবী প্রজাতির নেতিবাচক প্রভাবজনিত সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেন। তার ফলে ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও আলু চাষের পথ খুলে যায়। আজ সারা বিশ্ব মিলেট বা শ্রী অন্নকে সুপার ফুড হিসেবে দেখছে। কিন্তু এনিয়ে গবেষণা ও আলোচনার প্রসারে প্রফেসর স্বামীনাথন উৎসাহ দিয়ে গেছেন সেই ১৯৯০ –এর দশক থেকেই।

প্রফেসর স্বামীনাথনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগযোগ বহুদিনের। ২০০১–এ আমি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময় থেকেই তার সূচনা। ওই সময়ে কৃষিক্ষেত্রে গুজরাট অগ্রবর্তী রাজ্য হিসেবে তেমন পরিচিত ছিল না। একের পর এক খরা, সুপার সাইক্লোন এবং একটি বিধ্বংসী ভূমিকম্প রাজ্যটির বিকাশের পথে প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। পরিস্থিতির মোকাবিলায় আমরা যেসব উদ্যোগ নিই তার মধ্যে একটি ছিল সয়েল হেল্থ কার্ড- যা মাটির চরিত্র আরও ভালোভাবে বোঝা এবং কোনো সমস্যা এলে আরও ভালোভাবে তার মোকাবিলা করার পক্ষে সহায়ক। ওই সময়ে প্রফেসর স্বামীনাথনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি উল্লিখিত প্রকল্পটির প্রশংসা করেন এবং মূল্যবান মতামত দেন। ডঃ স্বামীনাথনের এই প্রশংসা প্রকল্পটি সম্পর্কে সন্দিহানদের মুখ বন্ধ করে। কৃষিক্ষেত্রে গুজরাটের সাফল্যের ভিত তৈরি হয়।

আমি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও প্রফেসর স্বামীনাথনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ২০১৬-য় আন্তর্জাতিক কৃষি-জীববৈচিত্র্য কংগ্রেসে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। ২০১৭-য় দুটি খণ্ডে তাঁর লেখা নিয়ে একটি বই প্রকাশ করি আমি।

তামিল ধ্রুপদী সাহিত্য ‘কুরাল’ বলে কৃষকরা বিশ্বের ধারক, কারণ তাঁরা রয়েছেন সর্বত্র। প্রফেসর স্বামীনাথন এই নীতিতে বিশ্বাস করতেন। অনেকে তাঁকে “কৃষি বৈজ্ঞানিক” বলে থাকেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তিনি ছিলেন আরও বেশি কিছু- “কিষাণ বৈজ্ঞানিক”। তাঁর মনন এবং চিন্তনে ছিল কৃষিজীবির অস্তিত্ব। ডঃ স্বামীনাথনের সাফল্য অবশ্যই লেখাপড়ার জগতে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রভাব পরিব্যাপ্ত পরীক্ষাগার পেরিয়ে- খেতে খামারে। তিনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে এনেছিলেন। ক্রমাগত তিনি ধারাবাহিক কৃষির ওপর জোর দিয়ে গেছেন- যা তুলে ধরে মানুষের অগ্রগতি এবং বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্যকে। ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং উদ্ভাবনার সুফল তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে প্রফেসর স্বামীনাথন যে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তার কথা উল্লেখ করতেই হয়। মহিলা কৃষিজীবীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রশ্নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গেছেন তিনি।

প্রফেসর স্বামীনাথনের ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি উদ্ভাবনা এবং পরামর্শ ও উৎসাহদানের প্রশ্নে ছিলেন ক্লান্তিহীন। ১৯৮৭ সালে বিশ্ব খাদ্য পুরস্কারের প্রথম প্রাপক হিসেবে পাওয়া অর্থ তিনি একটি অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজে লাগান। আজও ওই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে। একের পর এক প্রতিভাবানকে তিনি আরও শেখা এবং নতুন কিছু করে দেখানোয় উৎসাহিত করে গেছেন অক্লান্তভাবে। প্রতিষ্ঠান নির্মাতা হিসেবেও তাঁর অবদান ভোলার নয়। বহু উল্লেখযোগ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পেছনে তাঁর অবদান রয়েছে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ২০১৮-য় বারাণসীতে তৈরি হয় ওই প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কেন্দ্র।

ডঃ স্বামীনাথনের প্রতি শ্রদ্ধার অর্ঘ নিবেদনে আমি আবার “কুরাল”-এর শরণাপন্ন হতে চাই। সেখানে লেখা আছে “যাঁরা পরিকল্পনা করেন, তাঁরা যদি স্থিত প্রজ্ঞ হন তবে তাঁরা কাঙ্খিত উপায়ে কাঙ্খিত ফল লাভ করবেন।” ডঃ স্বামীনাথন প্রথম জীবনেই কৃষি এবং কৃষকদের জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেকাজ তিনি করেছেন অনন্য উদ্ভাবনী শক্তি এবং ভালোবাসার সঙ্গে। কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবনা ও ধারাবাহিকতার দিশায় এগোতে তিনি আমাদের সামনে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন। যে নীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন তার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে আমাদের। কৃষকদের কল্যাণে ব্রতী হওয়া, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনার সুফল কৃষি জগতের তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া, ধারাবাহিক বিকাশের প্রশ্নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং আগামী প্রজন্মের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করায় সচেষ্ট থাকলে তবেই তা সম্ভব।

Explore More
শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ

জনপ্রিয় ভাষণ

শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ
‘Shortcuts will cut you short’: PM Modi’s message for youngsters at former President Kovind’s autobiography launch

Media Coverage

‘Shortcuts will cut you short’: PM Modi’s message for youngsters at former President Kovind’s autobiography launch
NM on the go

Nm on the go

Always be the first to hear from the PM. Get the App Now!
...
ভারতের ঐক্য ও অগ্রগতির জন্য নিবেদিত একটি জীবন
July 06, 2026

আজ, ৬ই জুলাই, সেই অগণিত মানুষের জন্য একটি বিশেষ দিন যারা জাতীয়তাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শকে লালন করেন। আমরা ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করছি; তাঁর জীবন 'ভারতমাতা'-র প্রতি অটল নিষ্ঠা ও সাহসিকতার এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আধুনিক ভারতের খুব কম নেতাই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো মেধা, জনসেবা এবং নৈতিক দৃঢ়তার এমন এক অপূর্ব ও গভীর সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক হতে পেরেছিলেন।

তরুণ শ্যামাপ্রসাদ এমন এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যা সহজেই তাঁকে একটি সুরক্ষিত ও আরামদায়ক জীবন এনে দিতে পারত। তাঁর পিতা, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ছিলেন তৎকালীন যুগের অন্যতম প্রধান শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী। অথচ, ভাগ্য যখন তাঁর সামনে সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ জীবনের পথ উন্মুক্ত করেছিল, তখন তাঁর বিবেক তাঁকে ত্যাগ ও দেশসেবার পথে চালিত করেছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ঔপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক সংকটের মতো সমসাময়িক অস্থিরতার সময়ে তিনি কেবল নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারেন না। এই যাত্রাপথে তাঁকে গভীর ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হতে হয়েছিল - যার মধ্যে ছিল নিজের শিশুপুত্র ও পরবর্তীকালে স্ত্রীর অকালপ্রয়াণ। তবুও, এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কেবল তাঁর সংকল্পকে আরও দৃঢ় এবং সেবার প্রতি তাঁর অটল নিষ্ঠাকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনজীবনকে যদি কোনো একটি আদর্শ সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে থাকে, তবে তা হলো ভারতের অখণ্ডতা। দেশভাগের চরম অস্থিরতার সময়েও তিনি অবিচল ছিলেন যাতে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে থাকে। কয়েক বছর পর, সেই একই দৃঢ় বিশ্বাস তাঁকে জম্মু ও কাশ্মীরের দিকে ধাবিত করেছিল। কারাবাস তাঁকে দমাতে পারেনি এবং নিঃসঙ্গতাও তাঁর মনোবল কমাতে পারেনি। বন্দিদশাতেই তাঁর জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে - সেই অগণিত মানুষের থেকে বহু দূরে, যাদের স্বার্থরক্ষাকে তিনি নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কোনো ব্যক্তির চূড়ান্ত আত্মত্যাগ রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ডঃ মুখোপাধ্যায়ের শেষ যাত্রাও ছিল তেমনই এক মুহূর্ত। আচার্য বিনোবা ভাবে বলেছিলেন যে, ডঃ মুখোপাধ্যায় এমন এক আদর্শের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন যার ওপর তাঁর গভীর আস্থা ছিল। বহু বছর পর, ২০১৯ সালে ৩৭০ ও ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ রদ করার বিষয়টি ছিল তাঁর সেই আত্মবলিদানের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ড. মুখার্জি সর্বদা ভারত ও ভারতীয় মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এবং ব্যবস্থা প্রবর্তন করে তা করেছিলেন, যা তৎকালীন প্রথাগত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হয়েছিলেন। নিজস্ব অনন্য শৈলীতে তিনি এমন সব ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন যা ছিল দেশপ্রেমমূলক ও দূরদর্শী। শিক্ষাবিদদের এক সম্মেলনে ভাষণদানকালে ড. মুখার্জি চমৎকারভাবে বলেছিলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সম্ভাব্য করণিক বা স্বল্প বেতনের কর্মী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখা ভুল। আমাদের এমন সব শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে হবে যারা আমাদের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান - যেমন পৌরসভা, প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভা - পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে; পাশাপাশি যারা জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্র - যেমন অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প - পরিচালনার দায়িত্বও নিতে পারবে।”

তাঁর নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছু অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গ্রন্থাগারের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার প্রসার, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা শিল্পকর্মের অধ্যয়নে উৎসাহ প্রদান এবং কৃষি বিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু করা। তিনি খেলাধুলা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রকল্যাণের মতো বিষয়গুলোর প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ববোধ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি ২৪ জানুয়ারি তারিখটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে পালন করার প্রথা চালু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গান রচনার অনুরোধ নিয়ে তিনি স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

তাঁর এই মানসিকতার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে, যখন তিনি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এমন এক সময়ে যখন কংগ্রেস দলের সর্বব্যাপী প্রভাব ছিল, তখন তিনি অনুভব করেছিলেন যে ভারতের অগ্রগতির পক্ষে কথা বলার জন্য এবং একই সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখার জন্য একটি বিকল্প কণ্ঠস্বরের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। দলের প্রতীক হিসেবে মাটির প্রদীপ বা ‘দিয়া’-কে বেছে নেওয়াটা সম্ভবত অত্যন্ত যথার্থ ছিল। একটি প্রদীপ হয়তো দেখতে সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু তার চারপাশের অনেক দূর পর্যন্ত অন্ধকার দূর করার ক্ষমতা তার থাকে। সক্রিয় থাকাকালীন সময়ে এবং তার পরেও জনসংঘ ঠিক এই কাজটিই করেছিল।

ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির কার্যকাল এমন এক রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় তুলে ধরে, যার উন্নয়ন-ভাবনা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক ও মানবিক। তিনি শিল্পকে নবীন স্বাধীন একটি জাতির মর্যাদা, সুযোগ ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি সম্পদ সৃষ্টি এবং মূল্য সংযোজনের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতেন। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন ও সিন্দ্রি সার কারখানার মতো অগ্রগামী উদ্যোগ এবং একটি বলিষ্ঠ শিল্পনীতির মাধ্যমে আধুনিক শিল্প-ভারতের ভিত্তি স্থাপনের পাশাপাশি, তিনি এটাও নিশ্চিত করেছিলেন যেন ভারতের ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলো অবহেলিত না হয়। তাঁতশিল্প, কুটির শিল্প, কারিগর এবং বস্ত্রশিল্পের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক।

এখানে আমি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। আত্মনির্ভরশীলতার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ড. মুখার্জি যে সিন্দ্রি কারখানাটি গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছিলেন, পরবর্তী কয়েক দশক ধরে যারা দেশ পরিচালনা করেছেন, তাঁরা সেটিকে উপেক্ষা করেছিলেন। আমি গর্বিত যে, আমাদের সরকার এই কারখানাটির পুনরুজ্জীবনে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছে। সেই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে পারাটা সত্যিই অত্যন্ত বিশেষ একটি মুহূর্ত ছিল।

ভারতের সভ্যতার ঐতিহ্যে দীর্ঘকাল ধরেই আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড. মুখার্জি এই গণতান্ত্রিক চেতনারই মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তিনি পণ্ডিত নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন এই বিশ্বাস থেকে যে, স্বাধীনতার পরবর্তী প্রাথমিক বছরগুলোতে জাতি গঠনের কাজ রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে। তিনি নিষ্ঠা ও গঠনমূলক মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি অনুভব করলেন যে জাতীয় স্বার্থে ভিন্ন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তখন তিনি মর্যাদার সঙ্গে পদত্যাগ করেন এবং নিজেকে সেই রাজনৈতিক কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন যা তিনি দেশের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতেন।

৭৫ বছর আগে পণ্ডিত নেহরু সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এনেছিলেন, যা ছিল বাক-স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। ড. মুখার্জি ছিলেন এর অন্যতম কঠোর সমালোচক। কংগ্রেস কী করতে সক্ষম, তা তিনি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন। এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। যারা ৭৫ বছর আগে প্রথম সংশোধনী এনেছিল, তারাই ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল এবং ৫০ বছর আগে ৪২তম সংশোধনী আইন এনেছিল - যা আবারও উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মূলে আঘাত হেনেছিল।

মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও ড. মুখার্জি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ড. মুখার্জি দুর্গত মানুষের সেবায় নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেছিলেন। মানুষের অন্নসংস্থানের জন্য তিনি বেশ কয়েকটি ক্যান্টিন ও ত্রাণ কেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিকে যেমন তিনি তাঁর দেশের মানুষের দুর্দশা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসকদের অসংবেদনশীলতা তাঁকে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছিল। তিনি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তাঁর সেই গভীর বেদনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৪২ সালে মেদিনীপুরে যখন এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

কলকাতার একটি কলেজে ভাষণ দেওয়ার সময় ড. মুখার্জি তরুণদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “তোমরা যে কাজই হাতে নাও না কেন, তা অত্যন্ত গুরুত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং ভালোভাবে সম্পন্ন করো; কোনো কাজই কখনো অসম্পূর্ণ বা অসমাপ্ত রেখো না। যতক্ষণ না তোমরা নিজেদের সেরাটা দিয়ে কাজ শেষ করছ, ততক্ষণ কখনোই সন্তুষ্ট হয়ো না।” ভারত যখন ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদনের উপায় হলো - এমন এক শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল ভারত গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন সচেষ্ট হওয়া, যার ওপর তিনি গভীর আস্থা রাখতেন। আর আজকের তরুণ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করলে আমি নিশ্চিত যে, তারা এই গুরুদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে এবং ঠিক সেটাই করবে।