গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছার জয় যে অবশ্যম্ভাবী, সেটাই মালদ্বীপের জনগণ করে দেখিয়েছেন: প্রধানমন্ত্রী মোদী
ভালো ও খারাপ সময়েও আমরা যদি পরস্পরের বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করতে পারি, তবেই এটা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী
ভারত কেবলই নিজের সমৃদ্ধি ও সুরক্ষার জন্য নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করতে চায় না: প্রধানমন্ত্রী মোদী

মালদ্বীপের মজলিশে মাননীয় অধ্যক্ষ,

মালদ্বীপের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও আমার বন্ধু মহম্মদ নশীদজি,

মজলিশের মাননীয় সদস্যবৃন্দ,

 

মহামহিম মহোদয়গণ,

আমন্ত্রিত মাননীয় অতিথিবৃন্দ,

নমস্কার,

 

আপনাদের সবাইকে আমি নিজের পক্ষ ও ১৩০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই। ঈদ-উল-ফিতর – এর পবিত্র উৎসবে আনন্দ ও উৎসাহের রেশ এখনও আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। আপনাদের সবাইকে এবং মালদ্বীপের সমস্ত জনসাধারণকে এই উপলক্ষে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

মালদ্বীপ অর্থাৎ এক হাজারেরও বেশি দ্বীপের সমষ্ঠি – শুধু ভারত মহাসাগরই নয়, বিশ্বের মানচিত্রে এক অনুপম দ্বীপমালা। এর অপরিসীম সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ববাসীর আকর্ষণের কেন্দ্র। প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অদম্য সাহসের এক আশ্চর্য উদাহরণ এই দেশ, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সাক্ষী। আর এই রাজধানী মালে যেন বিশাল নীল সমুদ্রের প্রবেশদ্বার। পাশাপাশি, স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী ভারত মহাসাগর অঞ্চলেরও প্রবেশদ্বার।

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আজ মালদ্বীপের এই মজলিশে আপনাদের সবার মাঝে উপস্থিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। মাননীয় নশিদজী মজলিশের অধ্যক্ষ নির্বাচিত হওয়ার পর, প্রথম অধিবেশনেই  সর্বসম্মতিক্রমে এই মজলিশ যেভাবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আপনাদের এই আন্তরিকতা প্রত্যেক ভারতবাসীর হৃদয় স্পর্শ করেছে। প্রত্যেক ভারতবাসী সম্মানিত ও গৌরবান্বিত বোধ করছেন। সেজন্য আমি মাননীয় অধ্যক্ষ মহোদয় এবং এই গরিমাময় ভবনের প্রত্যেক সম্মাননীয় সদস্যকে সমগ্র ভারতবাসীর পক্ষ থেকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আজ আমি দ্বিতীয়বার মালদ্বীপে এসেছি। আরেকভাবে বলতে গেলে দ্বিতীয়বার এই মজলিশের ঐতিহাসিক অধিবেশনের সাক্ষী হতে পেরেছি। গত বছর আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি সোলিহ’র শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সামিল হতে পেরেছিলাম। গণতন্ত্রের জয় উপলক্ষে উন্মুক্ত স্টেডিয়ামে সেই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের শক্তি, বিশ্বাস, সাহস এবং সংকল্পের জোরেই সেই জয় এসেছিল। সেদিন আমি মালদ্বীপের গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিকে অনুভব করে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। সেদিন আমি মালদ্বীপের গনতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্পণ আর অধ্যক্ষ মহোদয় ও আপনাদের মতো সমস্ত নেতাদের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ও আবেগকে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আজ এই গরিমাময় ভবনে আমি আপনাদের মতো গণতন্ত্রের পূজারীদের করজোড়ে প্রণাম জানাই।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

এই মজলিশ শুধুই ইঁট, পাথরে গড়ে তোলা একটি ভবন নয়। এই ভবনে আপনাদের ভাবনাচিন্তা এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ও দেশের মানুষের হৃদস্পন্দন প্রতিধ্বনিত হয়। এখানে আপনাদের মাধ্যমে জনগণের স্বপ্ন এবং আশা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়।

 

এখানে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ এবং দলগুলির সদস্যরা দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য যাবতীয় সংকল্পগুলিকে সিদ্ধিতে রূপান্তর ঘটান। ঠিক এভাবেই কয়েক মাস আগে মালদ্বীপের জনগণ একত্রিত হয়ে বিশ্ববাসীর সামনে গণতন্ত্রের একটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন। আপনাদের সেই যাত্রা ছিল অনেক বন্ধুর।

 

কিন্তু গণতন্ত্রে জনগণের ইচ্ছার জয় যে অবশ্যম্ভাবী, সেটাই মালদ্বীপের জনগণ করে দেখিয়েছেন। এটা কোনও সাধারণ সাফল্য নয়, এই সাফল্য বিশ্ববাসীর সামনে একটি উদাহরণ ও প্রেরণা-স্বরূপ। আর এই সাফল্য থেকে কোন্‌ দেশবাসী সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছেন? উত্তরটা আপনাদের সকলেরই জানা। আপনাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আপনাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। আজ আপনাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, মালদ্বীপের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে ভারত এবং প্রত্যেক ভারতবাসী আপনাদের সঙ্গে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

ভারত-ও সম্প্রতি মানব ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করেছে। ১৩০ কোটি ভারতবাসীর জন্য এই নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রের মহোৎসব বা মেগা ফেস্টিভল। দেশের ভোটদাতাদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে উন্নয়ন এবং স্থায়ীত্বের পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন।

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আমার সরকারের মূলমন্ত্র ‘সবার সঙ্গে, সবার বিকাশ এবং সবার বিশ্বাস’। শুধু ভারতবাসী নয়, সমস্ত বিশ্ববাসী, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলির ক্ষেত্রে আমার সরকারের বিদেশ নীতির মূল ভিত্তি।

 

‘প্রতিবেশী আগে’ – এটাই আমাদের অগ্রাধিকার। আর প্রতিবেশীদের মধ্যে মালদ্বীপ যে অগ্রাধিকার পাবে – সেটাই স্বাভাবিক। সেজন্য আজ আপনাদের এই মজলিশে আমার উপস্থিতি কোনও কাকতালীয় ব্যাপার নয়। গত ডিসেম্বর মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পরই রাষ্ট্রপতি সোলিহ তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে গিয়েছিলেন। আর আমিও আরেকবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মালদ্বীপ মজলিশে সাদর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রথম বিদেশ সফরে মালদ্বীপে এসেছি। এবারের সফরে আপনাদের দেশের পক্ষ থেকে আমাকে বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত সবচেয়ে বড় সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানানোর উপযোগী কোনও শব্দ আমার জানা নেই।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্পর্ক ইতিহাসের থেকেও পুরনো। অনাদিকাল ধরে সমুদ্রের ঢেউ উভয় দেশের তটে নিরবচ্ছিন্নভাবে আছড়ে পড়ছে। এই ঊর্মিমালা উভয় দেশের জনগণের বন্ধুত্বের বার্তা বহন করে। আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি এই ঊর্মিমালার শক্তি নিয়ে প্রস্ফূটিত ও বিকশিত হয়েছে। আমাদের সম্পর্ক সমুদ্রের গভীরতা ও বিস্তারের আশীর্বাদধন্য। বিশ্বের সর্বপ্রাচীন সমুদ্র বন্দরগুলির মধ্যে অন্যতম লোথাল আমার নিজের রাজ্য গুজরাটের সৈকতে ছিল। আড়াই বছর আগে লোথাল ও পরবর্তীকালে সুরাটের মতো অন্যান্য বন্দরগুলির সঙ্গেও মালদ্বীপের সমুদ্র-বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল।

 

মালদ্বীপের ঝিনুক ভারতের শিশুরাও খুব পছন্দ করে। আমাদের সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র, আচার-ব্যবহার এবং আদব-কায়দা অনেকটাই একরকম। আপনাদের দিবেহী ভাষায় সপ্তাহকে ‘হপ্তা’ বলে, ভারতীয় অনেক ভাষাতেও তাই বলে। রবিবারকে দিবেহীতে বলে ‘আদীথা’ অর্থাৎ ‘আদিত্য’ বা সূর্য’। আমরাও একে রবিবার বলি। সোমবারকে দিবেহীতে ‘হোমা’ বলে, যা চন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, আমাদের দেশেও তেমনই ‘সোমবার’ বলা হয়। বিশ্বকে দিবেহীতে বলা হয় ‘ধুনিয়ে’ আর ভারতে বলা হয় ‘দুনিয়া’। মালদ্বীপেও ‘দুনিয়া’ একটি প্রসিদ্ধ নাম। ভারতে যাকে স্বর্গ বলা হয় দিবেহীতে তা ‘স্বুরগে’ এবং ভারতীয় ভাষায় যাকে ‘নরক’ বলা হয় সেটিকে দিবেহীতে বলা হয় ‘নরকা’। এই মিলের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ; এই নিয়ে গোটা একটি শব্দকোষ লিখে ফেলা যায়। সেজন্য সংক্ষেপে বলা যায় প্রতিটি পদক্ষেপে এটি প্রমাণিত যে আমরা একই বাগানের ফুল। তাই, মালদ্বীপের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, পান্ডুলিপি সংরক্ষণ এবং দিবেহী ভাষার শব্দকোষ উন্নয়নের মতো প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করাকে ভারত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করে।

 

সেজন্য আজ আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আপনাদের ‘ফ্রাইডে মস্ক’ – এর সংরক্ষণে ভারতের সহযোগিতার প্রতিশ্রতি ঘোষণা করছি। মালদ্বীপ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এরকম সুন্দর প্রবাল নির্মিত মসজিদ নেই। হাজার বছর আগে মালদ্বীপের অধিবাসীরা এই সামুদ্রিক ঐতিহ্য দিয়ে এই অনুপম কীর্তি গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি সম্মান ও ভারসাম্য রক্ষা প্রচেষ্টা অনুভব করা যায়।

 

দুঃখের বিষয় আজ সমগ্র পৃথিবীতে সমুদ্র সম্পদে দূষণের বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে এই প্রবাল মসজিদের সংরক্ষণ শুধু ইতিহাস নয়, সমগ্র বিশ্বকে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাও দেবে।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

মালদ্বীপের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি ও শান্তির সপক্ষে ভারত মালদ্বীপের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১৯৮৮ সালের সেই ভয়ানক বিপদ, ২০০৪ সালে সুনামির প্রলয়ঙ্করী দিনগুলিতে কিংবা সাম্প্রতিক পানীয় জলের সঙ্কটের সময়ে ভারত আপনাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে অত্যন্ত গর্ববোধ করে। এখন আমাদের উভয় দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং স্থৈর্য্যের পক্ষে উভয় দেশের জনগণের বিপুল সমর্থন আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন নতুন পথ খুলে দেবে।

 

রাষ্ট্রপতি সোলিহের বিগত ভারত সফরে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্যাকেজ সুনিশ্চিত হয়েছে। সেই চুক্তি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মালদ্বীপের জনগণের সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নের সহযোগিতাকে ভারত অগ্রাধিকার দিয়েছে। মালদ্বীপের পানীয় জল, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও ভারত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের সহযোগিতার ভিত্তি হ’ল জনকল্যাণ, মালদ্বীপের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারগুলি।

 

আমাদের কয়েক ডজন ‘সোস্যাল ইমপ্যাক্ট প্রোজেক্ট’ এবং অন্যান্য সহযোগী প্রকল্প মালদ্বীপের জনগণের জীবনকে সহজ করে তুলছে, তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আপনাদের প্রচেষ্টাগুলির পরিপূরক হয়ে উঠছে। মালদ্বীপের গণতন্ত্রকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে ভারত এক বিশ্বস্ত শক্তিশালী এবং অগ্রগণ্য সহযোগীর ভূমিকা পালন করে যাবে। আমাদের এই সহযোগ আপনাদের মতো সমস্ত জনপ্রতিনিধিদের হাতকে মজবুত করবে।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের সম্পর্ক শুধুই একটি সরকারের সঙ্গে আরেকটি সরকারের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উভয় দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় হলে তবেই তা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সেজন্য আমরা উভয় দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। আজ আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আজই আমরা উভয় দেশের মধ্যে নিয়মিত নৌ-পরিষেবার বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করতে পেরেছি। এছাড়া, আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্য সংক্রান্ত নানা কাজে যে মালদ্বীপবাসীরা ভারতে আসবেন, তাঁদের জন্য সহজে ভিসা প্রদানের চুক্তি সম্পাদন করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করার মাধ্যমে আমরা বর্তমান বিশ্বের নানা অনিশ্চয়তা এবং সমস্যাগুলিকে মাথায় রেখে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে আমরা যে সমস্ত বিপত্তির সম্মুখীন, শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে আর্থিক,  সামরিক, পরিবেশ ও সাইবার স্পেস নিয়ে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীতার ফলে নানা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আমি সেগুলির মধ্যে তিনটি সঙ্কটের কথা উল্লেখ করতে চাই, যা আমাদের উভয় দেশের পক্ষেই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আমাদের সময়ে একটি বড় সঙ্কট হ’ল সন্ত্রাসবাদ। এই সঙ্কট কোনও দেশ বা বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্কট নয়, এটি সমগ্র মানবতাকে সঙ্কটগ্রস্ত করে তুলেছে। এমন কোনও দিন নেই, যেদিন পৃথিবীর কোনও না কোনও দেশে সন্ত্রাসবাদের করালছায়কে অনুভব করা যায় না। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কোনও নির্দোষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদীদের নিজস্ব কোনও ব্যাঙ্ক, টাঁকশাল কিংবা অস্ত্র কারখানা নেই। কিন্তু তাদের কখনও অর্থ কিংবা অস্ত্রশস্ত্রের অভাব হয় না।

 

তারা এসবের যোগান কোথা থেকে পায়? সন্ত্রাসবাদের ‘স্টেট স্পনসরশিপ’ আজ বিশ্ববাসীর সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে আজও কেউ কেউ ভালো সন্ত্রাসবাদী ও খারাপ সন্ত্রাসবাদীর মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করার ভুল করছে। এই কৃত্রিম পার্থক্য এই মানবতার বিপদ মোকাবিলায় অনেক সময় নষ্ট করে দিচ্ছে। জল এখন মাথার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় আজ সমস্ত মানবতাবাদী শক্তিগুলি একত্রিত হওয়া প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের মোকাবিলাই এখন বিশ্ব-নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

যেভাবে বিশ্ববাসী আবহাওয়া পরিবর্তনের সংকটের মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে বিশ্বব্যাপী কনভেনশন ও সম্মেলনের আয়োজন করেছে, একইভাবে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেও সক্রিয় পদক্ষেপ কেন নেওয়া যাবে না?

 

আমি সমস্ত আন্তর্জাতিক সংগঠন ও উন্নত দেশগুলির কাছে আবেদন রাখব যে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হোক, যাতে সন্ত্রাসবাদী ও তাদের সমর্থকরা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনগুলির ফাঁক দিয়ে যেভাবে বেরিয়ে যায়, সেগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এক্ষেত্রে আমরা আর দেরী করলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

আমি আবহাওয়া পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছি। এতে কোনও সন্দেহ নেই, আমরা প্রতিদিন এই সমস্যাগুলির সম্মুখীন হচ্ছি। ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলি এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা আমাদের কৃষকদের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। হিমশৈলগুলি অস্বাভাবিক মাত্রায় গলে যাওয়া, সমুদ্র-স্তরে যেভাবে বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে, তা মালদ্বীপের মতো দেশগুলির অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। প্রবাল দ্বীপগুলি এবং সমুদ্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশা দূষণের কোপে সংকটগ্রস্ত।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আপনি সমুদ্রের গভীর তলদেশে বিশ্বের সর্বপ্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকের আয়োজন করে এই সংকট সম্পর্কে যেভাবে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন, তা কে ভুলতে পারেন!

 

মালদ্বীপ এক্ষেত্রে স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের জন্য আরও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, মালদ্বীপ আন্তর্জাতিক সৌরসঙ্ঘের সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীকে একটি ফলিত মঞ্চ প্রদান করেছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের অনেক কুফলকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে শক্তিশালী বিকল্প প্রদানের মাধ্যমে লাঘব করা সম্ভব।

 

ভারত ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং সেই লক্ষ্যসাধনে আমরা যে আশাতীত সাফল্য পেয়েছি, সে বিষয়ে এই সভা অবগত। ভারতের সহযোগিতায় এখন মালের সড়কপথগুলিও আড়াই হাজার এলইডি আলোর রোশনাইয়ে আলোকিত। ভারত, মালদ্বীপবাসীদের বাড়ি-ঘর ও দোকানে ব্যবহারের জন্য আরও দু’লক্ষ এলইডি বাল্ব দিয়েছে। এতে বিদ্যুতের খরচ এবং ব্যয়সাশ্রয় হবে। ছোট ছোট দ্বীপগুলিতে এমনই পরিবেশ-বান্ধব বিদ্যুতের যোগানকে ভারত অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাদের নানা বিশেষ সমস্যা সমাধানের জন্যও ভারত শুধু সহযোগিতা করেই থামেনি, বিশ্বের সমস্ত মঞ্চে আওয়াজ তুলেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আরও বড় মাত্রায় অনেক সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।

 

কেউ যদি ভাবেন, শুধু প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব, তা হলে ভুল ভাবছেন। সামাজিক মূল্যবোধ, ভাবনাচিন্তা ও জীবনশৈলীর পরিবর্তন ছাড়া পরিবেশের সঙ্কটগুলি দূর করা সম্ভব নয়। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে বলা হয়েছে যে, ‘মাতা ভূমিঃ, পুত্রহং পৃথ্বীয়াঃ’। আমরা যদি পৃথিবীকে মা বলে মনে করি, তা হলেই তাঁর সম্মান ও সংরক্ষণ করব, তাঁর কোনও ক্ষতি করব না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঐতিহ্য, আমরা এর প্রভু নই, নিছকই তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পেয়েছি।

অধ্যক্ষ মহোদয়া,

 

তৃতীয় বিষয়টি হ’ল, ভারত – প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্রে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন। ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনীতি এবং অর্থ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। ফল-স্বরূপ, এক্ষেত্রে অনেক উত্তরবিহীন প্রশ্ন এবং অমীমাংসিত বিবাদ রয়েছে। ভারত – প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্র আমাদের জীবনরেখা এবং বাণিজ্যের রাজমার্গও বটে। এখানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের চাবিকাঠি রয়েছে। সেজন্য আমি ২০১৮ সালের জুন মাসে সিঙ্গাপুর সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারত – প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য একত্রীকরণ এবং ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সকলকে একসঙ্গে মিলে কাজ করার কথা বলেছি। তবেই দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের আবহ গড়ে উঠবে আর নিয়ম ও সম্মতি ব্যবস্থায় ‘মাল্টি লেটারিলিজম’ স্থাপিত হবে।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

চার বছর আগে আমি ভারত মহাসাগর ক্ষেত্রের জন্য এসএজিএআর বা ‘সাগর’ – এর লক্ষ্য এবং সঙ্কল্পের প্রতিবদ্ধতাকে তুলে ধরেছিলাম। এই সাগর শব্দের হিন্দি অর্থ হ’ল সমুদ্র। আর এই সাগর বা সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ ফর অল ইন দ্য রিজিয়ন আমাদের জন্য ভারত – প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতার নীল নক্‌শা-স্বরূপ। আমি আজ এই মজলিশ থেকে আরেকবার এই সমন্বয়ের ভাবনার জন্য এই ক্ষেত্রের সমস্ত দেশগুলির কাছে আবেদন রাখব। আমি আপনাদের এটাও বলতে চাই যে, ভারত কেবলই নিজের সমৃদ্ধি ও সুরক্ষার জন্য নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করতে চায় না।

 

এই সমগ্র ক্ষেত্রের অন্যান্য দেশের ক্ষমতা উন্নয়নে বিপর্যয় মোকাবিলায় এবং সকল দেশের মিলিত নিরাপত্তা-সম্পন্নতা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যকে ব্যবহার করতে চায়। শক্তিশালী সামর্থবান ও সমৃদ্ধ ভারত শুধু দক্ষিণ এশিয়া কিংবা ভারত – প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্র নয়, সমস্ত বিশ্বে শান্তি, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার স্তম্ভ হয়ে উঠতে চায়।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

এই লক্ষ্যসাধনে নীল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মালদ্বীপ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সহযোগী। কারণ, আমরা সমুদ্র প্রতিবেশী, পরস্পরের বন্ধু। আর বন্ধুদের মধ্যে কেউ ছোট কিংবা বড়, দুর্বল কিংবা শক্তিশালী হয় না। শান্ত ও সমৃদ্ধ প্রতিবেশের ভিত্তি ভরসা, সদ্ভাবনা এবং সহযোগিতা-নির্ভর হয়ে থাকে।

 

আর এই ভরসা পারস্পরিক সহযোগিতা ও লাভের ক্ষেত্রে বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত হয়, যার দ্বারা আমরা উভয় দেশই আরও সমৃদ্ধ এবং সুরক্ষিত থাকব। ভালো ও খারাপ সময়েও আমরা যদি পরস্পরের বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করতে পারি, তবেই এটা সম্ভব।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

আমাদের দর্শন ও নীতির মূল কথা হ’ল ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’। অর্থাৎ গোটা বিশ্ব একটি পরিবার। যুগপুরুষ মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, প্রতিবেশীদের আমাদের পরিষেবাগুলি কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। ভারত সর্বদাই বিশ্বকে, বিশেষ করে প্রতিবেশীদের নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভবের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে এসেছে। সেজন্যে, ভারতের উন্নয়নও প্রতিবেশীদের উন্নয়নে সহযোগীর ভূমিকা পালন করবে, তাদের দুর্বল করে দেবে না, তাদেরকে আমাদের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলবে না কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে প্রভূত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে যাবে না।

 

অধ্যক্ষ মহোদয়,

 

বর্তমান সময় অনেক সংকটপূর্ণ জটিল সংক্রান্তির সময়। কিন্তু সংকট থেকেই সুযোগও তৈরি হয়। আজ ভারত ও মালদ্বীপের সামনে সুযোগ এসেছে :

 

প্রতিবেশীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শ হয়ে ওঠার;

পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশের জনগণের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্খাগুলি পূরণের;

নিজেদের এলাকায় স্থায়ীত্ব, শান্তি ও সুরক্ষা স্থাপনের ক্ষেত্রে মিলেমিশে কাজ করার;

বিশ্বের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে নিরাপদ রাখার;

সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করার;

সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদকে পোষণকারী সকল শক্তিকে দূরে সরানোর; এবং

সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন-সাধনের।

 

ইতিহাস এবং আমাদের প্রতি আমাদের জনগণের প্রত্যাশা এই আমরা যেন এই সুযোগগুলিকে হাতছাড়া না করি। এই সকল ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতার জন্য ভারত মালদ্বীপের সঙ্গে অমূল্য মৈত্রী আরও নিবিড় করতে দৃঢ় সংকল্প।

 

এই পবিত্র সংকল্পের কথা আজ আমি আপনাদের সামনে আরেকবার উচ্চারণ করছি। আপনারা আমাকে আপনাদের মধ্যে এসে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন।

 

আরেকবার এত বড় সম্মানের জন্য ধন্যবাদ জানাই। আ

আপনাদের বন্ধুত্বকে ধন্যবাদ।

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Explore More
শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ

জনপ্রিয় ভাষণ

শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরের ধ্বজারোহণ উৎসবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ
India’s startup game-changer? ₹10,000 crore FoF 2.0 set to attract investors

Media Coverage

India’s startup game-changer? ₹10,000 crore FoF 2.0 set to attract investors
NM on the go

Nm on the go

Always be the first to hear from the PM. Get the App Now!
...
Prime Minister condoles passing of renowned photographer Shri Raghu Rai
April 26, 2026

The Prime Minister has expressed deep sorrow over the passing of eminent photographer Raghu Rai, describing him as a creative stalwart who immortalised India’s vibrancy through his lens. Shri Modi noted that Shri Raghu Rai’s work was marked by extraordinary sensitivity, depth and diversity, capturing the many facets of life across India and bringing them closer to people.The Prime Minister remarked that his contribution to the world of photography and culture is unparalleled, and his passing is an irreparable loss to the artistic community.

The Prime Minister posted on X;

“Shri Raghu Rai Ji will be remembered as a creative stalwart, who captured India’s vibrancy through his lens. His photography had extraordinary sensitivity, depth and diversity. It brought people closer to the different aspects of life in India. His passing is an irreparable loss to the world of photography and culture. My thoughts are with his family, admirers and the photography fraternity in this hour of grief. Om Shanti.”