২১ অক্টোবর, ২০২১। ভারত ১০০ কোটি ডোজ টিকাকরণ সম্পন্ন করল। টিকাকরণ কর্মসূচি শুরুর মাত্র ন’মাসের মধ্যেই এল এই সাফল্য। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এ এক দুরূহ যাত্রা! বিশেষত ২০২০ সালের গোড়ার দিকে কী পরিস্থিতি ছিল, তা ফিরে দেখলেই আমরা বুঝতে পারব। ১০০ বছর বাদে মানব সমাজ আরও এক অতিমারির কবলে। এবং কেউ বিশেষ কিছু জানতও না এই ভাইরাস সম্পর্কে। মনে পড়ে, কেমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়! দ্রুত চরিত্র বদল করা এক অজানা, অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা।
সেই আশঙ্কা থেকে আশ্বাসের পথে যাত্রার সূচনা হল। ক্রমে বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানের সুবাদে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল আমাদের দেশ।
সমাজের একাধিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে এটা সত্যিই ভগীরথের মতো এক প্রয়াস। চেষ্টার মাত্রাটা বুঝতে গেলে একটা ছোট্ট তথ্য জেনে রাখা দরকার। প্রতিটি টিকা দিতে একজন স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীর সময় লাগে ২ মিনিট। সেই অনুযায়ী এই সাফল্যে পৌঁছতে লেগেছে প্রায় ৪১ লক্ষ মানব-দিবস অথবা আনুমানিক ১১ হাজার মানব-বর্ষের চেষ্টা।
বড় মাত্রার যে কোন প্রয়াসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে হলে সবার আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এই অভিযানের সাফল্যের অন্যতম কারণ সেটাই। এই টিকাকরণ এবং তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা রেখেছে মানুষ। যদিও অনাস্থা এবং আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা কম হয়নি।
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুমাত্র বিদেশি ব্র্যান্ডে আস্থা রাখেন। এমনকী সেটা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রেও। তবে, কোভিড-১৯ টিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতবাসী সর্বসম্মতিক্রমে আস্থা রেখেছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ভ্যাকসিনের উপর। এটা এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
নাগরিক এবং সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে জন ভাগিদারীর আদর্শকে সামনে রেখে এক হয়ে যায়, তাহলে ভারত যে কী করতে পারে এই টিকাকরণ অভিযান তার একটি উদাহরণ। ভারত যখন টিকাকরণ অভিযান শুরু করে, তখন অনেকেই ১৩০ কোটি মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কেউ বলেছিলেন, তিন-চার বছর সময় লাগবে ভারতের। কারও কারও দাবি ছিল, মানুষ টিকা নিতে এগিয়ে আসবেন না। এমনও অনেকে ছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন, গোটা বিষয়টি অব্যবস্থার চূড়ান্ত হবে এবং টিকাকরণ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এমনকী কেউ কেউ তো এও বলেছিলেন যে, ভারত সরবরাহ শৃঙ্খল অটুট রাখতে পারবে না। কিন্তু জনতা কারফিউ এবং তার পরবর্তী লকডাউনের মতোই ভারতবাসী দেখিয়ে দিয়েছে, তাঁদের আস্থাভাজন অংশীদার করে তোলা গেলে কী অভাবনীয় ফলই না হতে পারে।
যখন সকলে এগিয়ে আসেন, তখন অসম্ভব বলে কিছুই থাকে না। আমাদের স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীরা পাহাড়ে চড়ে, নদী পেরিয়ে দুর্গম জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন মানুষকে টিকা দিতে। ভারতে টিকা নিয়ে অনাগ্রহীর সংখ্যা ছিল বেশ কম, যা অনেক উন্নত দেশেও দেখা যায়নি। তার জন্য আমাদের যুব সমাজ, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মী, সামাজিক এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রত্যেকেরই অভিনন্দন প্রাপ্য।
টিকাকরণ অভিযানে অগ্রাধিকার চেয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিভিন্ন রকম চাপ ছিল। কিন্তু সরকার এটা নিশ্চিত করেছে যে, অন্য অনেক কর্মসূচির মতো টিকাকরণ অভিযানেও কোন ভিআইপি সংস্কৃতি থাকবে না।
২০২০-র গোড়ায় যখন কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তখন থেকেই আমাদের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে, টিকার সাহায্য নিয়ে এই অতিমারির মোকাবিলা করতে হবে। সেইমতো আমরা প্রস্তুতি শুরু করে দিই। বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী গঠন করি। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকেই একটি রোডম্যাপ সাজিয়ে ফেলি।
আজ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি দেশই নিজেরা টিকা তৈরি করতে পেরেছে। ১৮০টিরও বেশি রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে কয়েকটি মাত্র উৎপাদকের ওপরেই নির্ভরশীল। বেশ কিছু দেশ এখনও টিকা হতে পাওয়ার অপেক্ষায়। সেখানে ভারত ১০০ কোটি ডোজের মাত্রা অতিক্রম করে গিয়েছে! একবার পরিস্থিতিটা ভাবুন—যদি ভারতের নিজস্ব টিকা না থাকত, তাহলে ভারত কীভাবে এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করত? এবং তার জন্য কত বছর সময় লাগত? এখানেই অভিনন্দন জানাতে হয় ভারতীয় বিজ্ঞানী এবং উদ্যোগপতিদের, যাঁরা সময়মতো এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের প্রতিভা এবং কঠোর পরিশ্রমের জন্যই আজ টিকার ক্ষেত্রে ভারত সত্যিকারের আত্মনির্ভর হয়ে উঠেছে। আমাদের টিকা নির্মাতারা এই বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে উৎপাদনও বাড়িয়েছেন, যার থেকে প্রমাণ হয়েছে যে তারা অদ্বিতীয়।
যে দেশে সরকারকে সাধারণত এগিয়ে চলার পথে বাধা হিসেবে ধরা হয়, সেখানে আমাদের সরকার প্রগতিকে গতি দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে। প্রথম দিন থেকেই টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে থেকেছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থদানের পাশাপাশি বিধিনিয়ম প্রক্রিয়ার গতি এনে সাহায্য করেছে। সরকারের সব মন্ত্রক একসঙ্গে টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অপসারণ করা হয়েছে যে কোনও বাধা। ভারতের মতো বিশাল দেশে শুধু টিকা প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। নজর দিতে হয়েছে শেষ বিন্দু পর্যন্ত তা পৌঁছনো এবং বাধাহীন লজিস্টিকসের উপর। যে সমস্যাগুলি ছিল, তা বুঝতে হলে ভ্যাকসিনের একটি ভায়ালের যাত্রার কথাটা ভাবুন। পুনে অথবা হায়দরাবাদের একটি কারখানা থেকে ভায়াল পাঠানো হয় যে কোনও রাজ্যের একটি হাবে। সেখানে থেকে সেটি জেলার হাবে যায়। সেই হাব থেকে তা পৌঁছে দেওয়া হয় টিকাকরণ কেন্দ্রে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিমান অথবা ট্রেনে কয়েক হাজার ট্রিপ। এই সম্পূর্ণ যাত্রাপথে টিকার ভায়াল একটি নির্দিষ্টমাত্রায় তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যা কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধানে থাকে। এর জন্য ১ লক্ষের বেশি কোল্ডচেন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। আগেভাগেই টিকা সরবরাহের সূচি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকেও। যাতে তারা ভালোভাবে সব পরিকল্পনা করতে পারেন এবং টিকাও পূর্বনির্ধারিত দিনেই তাদের কাছে পৌঁছয়। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব প্রয়াস।
এই সমস্ত প্রয়াসকে সাহায্য করেছে কো-উইনের মতো একটি শক্তিশালী টেক প্ল্যাটফর্ম। টিকাকরণ অভিযান যাতে সুষ্ঠু ও সঠিক মাত্রায় হয়, যাতে নজর রাখা যায় এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকে—তা নিশ্চিত করেছে কো-উইন। এর ফলে স্বজনপোষণ বা লাইন ভেঙে আগেভাগে যাওয়ার কোন জায়গাই ছিল না। একজন গরিব শ্রমিক নিজের গ্রামে প্রথম ডোজটি নিলেও নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে যাতে শহরের কর্মস্থলে এসে দ্বিতীয় ডোজটি নিতে পারেন, সেটাও নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বচ্ছতা বাড়াতে রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ডের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে কিউআর কোড দেওয়া সার্টিফিকেট। যাতে পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চয়তা মেলে। এই ধরণের প্রয়াসের নজির শুধু ভারতেই নয়, সারা বিশ্বে বিরল।
২০১৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে আমি বলেছিলাম যে, আমাদের দেশ সামনের দিকে এগচ্ছে ‘টিম ইন্ডিয়া’-র জন্য। এই ‘টিম ইন্ডিয়া’ আমাদের ১৩০ কোটি মানুষের একটি বড় দল। মানুষের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যদি ১৩০ কোটি ভারতীয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ চালাই, তাহলে দেশ প্রতি মুহূর্তে ১৩০ কোটি পা এগিয়ে যাবে। আমাদের টিকাকরণ অভিযান আরও একবার দেখাল এই ‘টিম ইন্ডিয়া’-র ক্ষমতা। টিকা কর্মসূচিতে ভারতের সাফল্য সারা বিশ্বকে এও দেখাল যে, ‘গণতন্ত্র করে দেখাতে পারে’!
বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে, তা আমাদের যুব সমাজ, উদ্ভাবক এবং সরকারের সব স্তরকে জনপরিষেবায় নতুন মাত্রা পৌঁছতে উৎসাহিত করবে বলেই আমি আশাবাদী। আর সেটা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠবে একটি মডেল।
সোমনাথ... এই নামটি শুনলেই আমাদের হৃদয় ও মনে এক গভীর গর্বের অনুভূতি জাগে। এটি ভারতের আত্মার এক শাশ্বত ঘোষণা। এই মহিমান্বিত মন্দিরটি ভারতের পশ্চিম উপকূলে গুজরাটের প্রভাস পত্তন নামক স্থানে অবস্থিত। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ স্তোত্রে ভারতের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের কথা উল্লেখ আছে। স্তোত্রটি শুরু হয়েছে “সৌরাষ্ট্রে সোমনাথং চ...” দিয়ে, যা প্রথম জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে সোমনাথের সভ্যতাগত ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে প্রতীকায়িত করে।আরও বলা হয়:

সোমলিঙ্গং নরো দৃষ্ট্বা সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।
লভতে ফলং মনোবাঞ্ছিতং মৃতঃ স্বর্গং সমাশ্রয়েৎ॥
এর অর্থ: শুধুমাত্র সোমনাথ শিবলিঙ্গের দর্শন করলেই মানুষ পাপমুক্ত হয়, তাঁর সৎ মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভ করে।
দুর্ভাগ্যবশত, এই সেই সোমনাথ, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা আকর্ষণ করত, তা বিদেশি আক্রমণকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, যাদের উদ্দেশ্য ছিল ধ্বংস, ভক্তি নয়।
২০২৬ সালটি সোমনাথ মন্দিরের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মহান তীর্থস্থানে প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে গজনীর মাহমুদ এই মন্দির আক্রমণ করেছিলেন, একটি হিংস্র ও বর্বর আক্রমণের মাধ্যমে বিশ্বাস ও সভ্যতার এক মহান প্রতীককে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে।
তবুও, এক হাজার বছর পরেও মন্দিরটি আগের মতোই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ সোমনাথকে তার পূর্বের মহিমায় ফিরিয়ে আনার জন্য অসংখ্য প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এমনই একটি পুনর্নির্মাণের মাইলফলক ২০২৬ সালে ৭৫ বছর পূর্ণ করবে। ১৯৫১ সালের ১১ই মে তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনর্নির্মিত মন্দিরটি ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল।

এক হাজার বছর আগে ১০২৬ সালে সোমনাথের ওপর প্রথম আক্রমণ, শহরের মানুষের উপর বর্বর অত্যাচার এবং মন্দির ধ্বংসের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে।সেগুলি পড়লে হৃদয় কেঁপে ওঠে। প্রত্যেক লাইনে যাতনা, নিষ্ঠুরতা এবং এমন এক বেদনার ভার রয়েছে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হতে চায় না।
ভাবুন তো, এটি ভারত এবং তখনকার মানুষের মনোবলকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। সর্বোপরি, সোমনাথের একটি বিশাল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ছিল। এটি সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ছিল, যা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী সমাজকে শক্তি যোগাত, যাদের বণিক ও নাবিকরা এর মহিমার কথা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
তবুও, আমি গর্বের সাথে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পরেও সোমনাথের গল্পকে সেই ধ্বংসযজ্ঞ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় নি। এটির অস্তিত্ব ভারতমাতার কোটি কোটি সন্তানের অটুট সাহস দিয়ে সংজ্ঞায়িত।
১০২৬ সালে শুরু হওয়া সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতা অন্যদেরকেও সোমনাথকে বারবার আক্রমণ করতে ‘অনুপ্রাণিত’ করেছিল। এটি ছিল আমাদের মানুষ ও সংস্কৃতিকে দাসত্বে আবদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টার শুরু। কিন্তু, প্রতিবার যখন মন্দিরটি আক্রান্ত হয়েছে, তখনও আমাদের দেশে এমন মহান পুরুষ ও মহিলারা ছিলেন, যারা এটিকে রক্ষা করার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছেন, এমনকি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগও করেছেন।আর প্রতিবারই, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, আমাদের মহান সভ্যতার ধারকরা নিজেদেরকে সামলে নিয়েছেন, মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ ও পুনরুজ্জীবিত করেছেন। আমরা ভাগ্যবান যে আমরা সেই একই মাটিতে লালিত হয়েছি যা অহল্যাবাই হোলকারের মতো মহান ব্যক্তিদের লালন করেছে, যিনি ভক্তদের সোমনাথে প্রার্থনা করা সুনিশ্চিত করতে একটি মহৎ প্রয়াস করেছিলেন।
১৮৯০-এর দশকে স্বামী বিবেকানন্দ সোমনাথ পরিদর্শন করেন এবং সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৮৯৭ সালে চেন্নাইতে একটি বক্তৃতার সময় তিনি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, “দক্ষিণ ভারতের এই পুরোনো মন্দিরগুলি এবং গুজরাটের সোমনাথের মতো মন্দিরগুলি আপনাকে বিপুল জ্ঞান শিক্ষা দেবে, যেকোনো বইয়ের চেয়েও জাতির ইতিহাস সম্পর্কে আপনাকে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি দেবে। লক্ষ্য করুন, কীভাবে এই মন্দিরগুলি শত শত আক্রমণ এবং শত শত পুনরুজ্জীবনের চিহ্ন বহন করছে, ক্রমাগত ধ্বংস হয়েও ধ্বংসস্তূপ থেকে অবিরাম মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, পুনরুজ্জীবিত ও আগের মতোই শক্তিশালী হয়ে! এটাই জাতীয় মন, এটাই জাতীয় জীবনধারা। একে অনুসরণ করুন, এটি আপনাকে গৌরবের পথে নিয়ে যাবে। আর একে ত্যাগ করলে ধ্বংস হবে; মৃত্যু হবে একমাত্র ফলাফল, বিলুপ্তি হবে একমাত্র পরিণতি, যে মুহূর্তে আপনি সেই জীবনধারা থেকে সরে যাবেন।”

স্বাধীনতার পর সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের পবিত্র দায়িত্বটি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো যোগ্য ব্যক্তির হাতে আসে। ১৯৪৭ সালের দিওয়ালির সময়কার একটি সফর তাঁকে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে তিনি ঘোষণা করেন, সেখানেই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হবে। অবশেষে, ১৯৫১ সালের ১১ই মে সোমনাথের একটি বিশাল মন্দির ভক্তদের জন্য তার দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ঐতিহাসিক দিনটি দেখার জন্য মহান সর্দার সাহেব জীবিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন জাতির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এই ঘটনায় খুব একটা উৎসাহিত ছিলেন না। তিনি চাননি যে মাননীয় রাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রীরা এই বিশেষ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বলেছিলেন যে এই ঘটনা ভারতের সম্পর্কে একটি খারাপ ধারণা তৈরি করেছে। কিন্তু ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর অবস্থানে অটল ছিলেন এবং বাকিটা ইতিহাস। কে এম মুন্সির প্রচেষ্টা স্মরণ না করলে সোমনাথের কোনো আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না, যিনি সর্দার প্যাটেলকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে সমর্থন করেছিলেন। সোমনাথ নিয়ে তাঁর কাজ, যার মধ্যে ‘সোমনাথ: দ্য শ্রাইন ইটার্নাল’ বইটি অন্তর্ভুক্ত, অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং শিক্ষামূলক।
প্রকৃতপক্ষে, মুন্সিজির বইয়ের শিরোনাম যেমনটি প্রকাশ করে, আমরা এমন একটি সভ্যতা যা আত্মা এবং ধারণার অমরত্ব সম্পর্কে একটি দৃঢ় বিশ্বাস বহন করে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে যা শাশ্বত তা অবিনশ্বর, যেমনটি গীতার বিখ্যাত শ্লোকে বলা হয়েছে “নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি…”। সোমনাথের চেয়ে আমাদের সভ্যতার অদম্য চেতনার আর কোনো ভালো উদাহরণ হতে পারে না, যা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামকে জয় করে গৌরবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
এই একই প্রাণশক্তি আমাদের জাতির মধ্যেও দৃশ্যমান, যা শত শত বছরের আক্রমণ ও ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন কাটিয়ে বৈশ্বিক অগ্রগতির অন্যতম উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আমাদের মূল্যবোধ এবং জনগণের দৃঢ় সংকল্পই আজ ভারতকে বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব আজ ভারতকে আশা ও আশাবাদের চোখে দেখছে। তাঁরা আমাদের উদ্ভাবনী তরুণদের কর্মযজ্ঞে অর্থবিনিয়োগ করতে চায়। আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং বিভিন্ন উৎসব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যোগ ও আয়ুর্বেদ বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলছে এবং সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে। বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি কিছু সমস্যার সমাধান আসছে ভারত থেকে।

অনাদিকাল থেকে সোমনাথ বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একত্রিত করেছে। শত শত বছর আগে, শ্রদ্ধেয় জৈন সন্ন্যাসী কালিকাল সর্বজ্ঞ হেমচন্দ্রাচার্য সোমনাথে এসেছিলেন। কথিত আছে, সেখানে প্রার্থনা করার পর তিনি একটি শ্লোক আবৃত্তি করেছিলেন, “ভববীজাঙ্কুরজননা রাগাঘাঃ ক্ষয়মুপগতা যস্য।” এর অর্থ - "তাঁকে প্রণাম, যাঁর মধ্যে পার্থিব অস্তিত্বের বীজ ধ্বংস হয়ে গেছে, যাঁর মধ্যে আসক্তি এবং সমস্ত ক্লেশ বিলীন হয়ে গেছে।" আজও সোমনাথ মন ও আত্মার গভীরে কিছু গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তোলার সেই একই ক্ষমতা রাখে।
১০২৬ সালের প্রথম আক্রমণের হাজার বছর পরেও সোমনাথের সমুদ্র আজও সেই একই তীব্রতায় গর্জন করে। সোমনাথের তীরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো একটি গল্প বলে। যাই ঘটুক না কেন, ঢেউগুলোর মতোই এটি বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
অতীতের আক্রমণকারীরা এখন বাতাসে ধূলিকণা, তাদের নাম ধ্বংসের সমার্থক। তারা ইতিহাসের পাতায় পাদটীকায় পরিণত হয়েছে, আর সোমনাথ উজ্জ্বল হয়ে দিগন্ত ছাড়িয়ে আলো ছড়াচ্ছে, যা আমাদের সেই শাশ্বত চেতনার কথা মনে করিয়ে দেয় যা ১০২৬ সালের আক্রমণেও অম্লান ছিল। সোমনাথ হলো আশার এক গান, যা আমাদের বলে যে ঘৃণা ও ধর্মান্ধতা হয়তো এক মুহূর্তের জন্য ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু মঙ্গলের শক্তিতে বিশ্বাস ও আস্থার ক্ষমতা রয়েছে অনন্তকাল ধরে সৃষ্টি করার।

যদি হাজার বছর আগে আক্রান্ত এবং তারপর থেকে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হওয়া সোমনাথ মন্দির বারবার পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, তবে আমরাও নিশ্চয়ই আমাদের মহান জাতিকে সেই গৌরবে ফিরিয়ে আনতে পারব, যা হাজার বছর আগে আক্রমণের পূর্বে তার মধ্যে মূর্ত ছিল। শ্রী সোমনাথ মহাদেবের আশীর্বাদে, আমরা একটি উন্নত ভারত গড়ার নতুন সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছি, যেখানে সভ্যতার জ্ঞান আমাদের সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পথ দেখাবে।
জয় সোমনাথ!


