সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দু'বছর সম্পন্ন করলেন। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ সামলাচ্ছেন সাত বছর। স্থায়ী সরকারে থেকে কাজ করার জন্য তিনি যথেষ্ট সময় পেয়েছেন। তাহলে, কিভাবে আমরা প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই শাসনকালকে ব্যাখ্যা করব?
সব থেকে সহজ উপায় হল তাঁর সমস্ত কৃতিত্বকে বিচার করা বিশেষ করে যেগুলো পরিমাপযোগ্য। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় ফ্ল্যাগশিপ যোজনাগুলো যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেই সংখ্যা বিচার করলেও বোঝা যায়। জন ধন যোজনার মাধ্যমে যাঁদের ব্যাঙ্কের খাতাই ছিল না, তাঁদের খাতা খোলা। প্রায় ৪২ কোটি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে-এভাবেই ভারতের প্রতিটি ঘরকে অর্থনীতির সঙ্গে জুড়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদী। যাদের মূলধন ছিলনা মুদ্রা ঋণের মাধ্যমে তাঁদের-২৯ কোটি অনুমোদন করা হয়েছে ও ১৫ লক্ষ কোটি টাকা বণ্টন করা হয়েছে। এভাবে দেশে উদ্যোগপতিদের দেশের কাজের জন্য উৎসাহিত করেছেন তিনি। ইউপিআই’এর মাধ্যমে ডিজিটাইজিং-এর পথে হাঁটা, ২০২০-তে ২৫ বিলিয়নের রিয়েল-টাইম লেনদেন হয়েছে। এভাবেই বিশ্বের সব থেকে বড় লেনদেনের পরিবেশ গড়ে উঠল ভারতে।
যদিও এই উল্লেখযোগ্য নম্বর ছাড়া অন্যভাবেও মোদীর সফলতা তুলে ধরা যায়- আমাদের দেশের যে চরিত্র ছিল তা বদল ঘটানো। কি সেই পরিবর্তন?
প্রথমত, আগে যে উপায়ে প্রশাসন অর্থনৈতিক নীতি তৈরি করত প্রধানমন্ত্রী মোদী সেই বুনিয়াদটাই বদলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর আগে তারা মুলত ক্ষুদ্র অর্থনীতি এবং তাঁর শুধু বাহ্যিক রূপটাই তুলে ধরত এবং অতিক্ষুদ্র শিল্পকে হয় উপেক্ষা করত নয় রাজ্য সরকারগুলোর ঘারে ঠেলে দিত। সেই কারণে স্বাধীনতার প্রায় ৬৬ বছর পরেও (২০১৪ সালে মোদী সরকার আসার আগে) দেশে অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, গ্রামে গ্রামে ছিলনা সঠিক শৌচ ব্যাবস্থা অথবা চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
মোদী সেই ভারসাম্যহীনতা দূর করেছে। প্রতিটি বাড়িতে যেমন জল পৌঁছে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কৃষি আইনে সংশোধনী এনে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিতে চাইছে। কৃষি ক্ষেত্রে যে শ্লথ ব্যাপার ছিল সেটাতেই পরিবর্তন এনেছে মোদী সরকার।
দ্বিতীয়ত, সরকারের কাছ থেকে ‘আমরা আর কি ভাল পাব’ - সাধারণ মানুষের যে এই মনোভাব ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদী সেটাকেই বদলে দিয়েছেন। দেশের মানুষ আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে বা পিছিয়ে থাকতে চায় না। পৃথিবীতে যদি করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবথেকে কার্যকরী কোনও টিকা এক বছরের মধ্যে বানিয়ে থাকে তা হল আমাদের দেশ, ভারত শুধু দেশীয় টিকা বানাতেই অগ্রনি ভুমিকা নিয়েছে তা নয় বরং যে গতিতে কাজ করছে তা বিশ্বে দ্রুততম।
তৃতীয়ত, ৭০ বছরের বদ্ধমূল ধারণাকে বদলাতে পেরেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, বিশেষ করে যখন অপর কোনও শক্তির মুখোমুখি হয়েছে। চীন যখন একাধিক রাস্তায় ভারতকে আক্রমণ করছিল তখন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে ডকলাম এবং প্যাংগং লেক সবদিক থেকে পিছু হটে তারা। আবহাওয়া পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হোক বা মুক্ত বানিজ্যিক চুক্তি, বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ধারণাকে বদলে ভারত এখন শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছে। এখন সবাই বুঝতে পেরেছে ২০২১’র ভারত আর ২০১৪’র ভারত এক নয়।
চতুর্থত, আমাদের বিদেশ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এটি আর মোরাল সায়েন্স লেকচার নেই, বরং এখন হার্ড-কোর জাতীয় স্বার্থে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়েছে। ব্যবহারিক রাজনীতি এখন গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডিং থেকে সরে আর্সেনালের অংশ হয়েছে।
পঞ্চম, বেসরকারি সংস্থাকে বৈধতা দেওয়া এখন আর কঠিন কাজ নয়। উদ্যগপতিদের সেই দৃঢ়তা প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে দিয়েছে-তাঁদের দেশ নির্মাতা আখ্যা দিয়েছে-সংসদে ইতিমধ্যে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, খুব শীঘ্রই তা আইনি মান্যতা পাবে।
ষষ্ঠ, মহিলাদের ক্ষমতায়ন ও সামজিক বলয় থেকে তাঁদের মুক্ত করা প্রধানমন্ত্রী মোদীর সময়ে অন্যতম উল্লেখযোগ্য সামাজিক দায়বদ্ধতা। প্রশাসনেই হোক বা কেন্দ্রের সব থেকে উল্লেখযোগ্য মন্ত্রিত্বের পদে বা সেনা বাহিনীতে স্থায়ী পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে, কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র শিল্পে মহিলাদের নিয়োগ বা কর্পোরেট দুনিয়ায়, সামজিক বঞ্চনা তিন তালাক পদ্ধতি থেকে পূর্বপুরুষের জমির আধিকার-মহিলাদের আটকাতে যত বাঁধা ছিল সমস্ত ভেঙ্গে গুরিয়ে দিয়েছে মোদী প্রশাসন।
সপ্তম, সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী অবদান হল আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে আমাদের দেশের ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করা। দেশে এখন রাম মন্দির তৈরি হচ্ছে সেই সঙ্গে এএসএটি মিশন ও গগনায়নের উৎক্ষেপণের অপেক্ষা করছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর সরকারই দশের ইতিহাসে একমাত্র সরকার যারা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। যেখানে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ব্যপক ভাবে আছরে পরেছে, সেখানে দেশের মানুষকে সেবা-পরিষেবার মধ্যমেই মোদী সরকার তাঁদের সাত বছর পূর্ণ করল। এটা শুধু নৈতিক পর্যায়ে আটকে নেই বরং যারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে তাঁদের প্রতি একটা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। সর্বপরি সরকারের ভুমিকা কীভাবে শাসন থেকে সেবায় রূপান্তরিত হয়েছে-এবং এটাই প্রধানমন্ত্রী মোদীর সব থেকে বড় কৃতিত্ব।


