মহামান্য আমার বন্ধু, রাষ্ট্রপতি পুতিন, ভারত ও বিদেশের সকল নেতা, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকগণ, নমস্কার।
ভারত রাশিয়া ব্যবসা ফোরাম, আমি বিশ্বাস করি যে এত বড় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আজ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া রাষ্ট্রপতি পুতিনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। আর আমি আপনাদের সকলকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে স্বাগত জানাই, এবং আপনাদের সকলের মধ্যে উপস্থিত থাকা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি উপলক্ষ। এই ফোরামে যোগদান এবং তাঁর মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমি আমার বন্ধু রাষ্ট্রপতি পুতিনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ব্যবসার জন্য সরলীকৃত পূর্বাভাসযোগ্য প্রক্রিয়া তৈরি করা হচ্ছে। ভারত এবং ইউরেশিয়ান অর্থনৈতিক ইউনিয়নের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আর বন্ধুগণ,
পীযূষ জি যেমন উল্লেখ করেছেন, এই বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়গুলিতে এবং রাষ্ট্রপতি পুতিন বর্ণিত সম্ভাবনাগুলি দেখে, আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো। ব্যবসায়িক হোক বা কূটনীতি, যে কোনও অংশীদারিত্বের ভিত্তি হল পারস্পরিক বিশ্বাস। এই বিশ্বাস ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তি আমাদের যৌথ প্রচেষ্টাকে দিকনির্দেশ দেয় এবং গতিপ্রদান করে। এটি হল সেই লঞ্চ প্যাড যা আমাদের নতুন স্বপ্ন এবং নতুন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে উড়তে অনুপ্রাণিত করে। গত বছর, রাষ্ট্রপতি পুতিন এবং আমি ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। কিন্তু গতকাল থেকে রাষ্ট্রপতি পুতিনের সঙ্গে আমার কথোপকথন এবং আমরা যে সম্ভাবনাগুলি দেখছি সেগুলির উপর ভিত্তি করে, আমার মনে হয় না যে, আমাদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমি তা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, এবং আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। শুল্ক এবং অ-শুল্ক বাধা হ্রাস করা হচ্ছে।

কিন্তু বন্ধুগণ,
এই প্রচেষ্টার পেছনে আসল শক্তি নিহিত আছে আপনাদের মতো ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে। আপনাদের শক্তি, আপনাদের উদ্ভাবন এবং আপনাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই আমাদের ভাগ করা ভবিষ্যৎকে রূপ দেয়।
বন্ধুগণ,
গত ১১ বছরে আমরা ভারতে যে গতি এবং মাত্রায় পরিবর্তন এনেছি তা অভূতপূর্ব। সংস্কার, কর্মক্ষমতা এবং রূপান্তরের নীতি অনুসরণ করে ভারত দ্রুত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে চলেছে। আর এই ১১ বছরের সংস্কার যাত্রায়, আমরা ক্লান্তও হইনি বা থেমেও যাইনি। আমাদের সংকল্প আগের চেয়েও শক্তিশালী, এবং আমরা আমাদের লক্ষ্যের দিকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। জিএসটিতে পরবর্তী প্রজন্মের উপযোগী সংস্কার এবং সম্মতি হ্রাস ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজে ব্যবসা করার সুবিধা বৃদ্ধির জন্য গৃহীত পদক্ষেপ। প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, এই ক্ষেত্রগুলিতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন, আমরা অসামরিক পারমাণবিক ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছি। এগুলি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং মানসিকতার সংস্কার। এই সংস্কারের পিছনে কেবল একটিই সংকল্প রয়েছে, একটি উন্নত ভারত।

বন্ধুগণ,
গতকাল এবং আজ আমাদের মধ্যে খুবই কার্যকর এবং অর্থবহ আলোচনা হয়েছে। আমি খুশি যে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতার সকল ক্ষেত্রে এই বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। আপনাদের সকলের পরামর্শ এবং প্রচেষ্টার জন্য আমি আপনাদের সকলকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাই। আমার পক্ষ থেকে, আপনাদের সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি কিছু ধারণা দিতে চাই। প্রথমত, সরবরাহ এবং সংযোগের ক্ষেত্রে আজকের বৈঠকে, রাষ্ট্রপতি পুতিন এবং আমি আমাদের সংযোগের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছি। আমরা আইএনএসটিসি অথবা উত্তর সমুদ্রপথ, অর্থাৎ চেন্নাই-ভ্লাদিভোস্তক করিডোর, উভয় ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শীঘ্রই এক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে। এটি ট্রানজিটের সময় হ্রাস করবে, খরচ কমাবে এবং ব্যবসার জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত করবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির শক্তির সাহায্যে, আমরা ভার্চুয়াল ট্রেড করিডোরের মাধ্যমে শুল্ক, সরবরাহ এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলিকে সংযুক্ত করতে পারি। এটি শুল্ক ছাড়পত্র দ্রুততর করবে, কাগজপত্রের ব্যবহার কমাবে এবং পণ্য পরিবহনকে আরও নির্বিঘ্ন করবে। দ্বিতীয়তঃ, সামুদ্রিক পণ্যের ক্ষেত্রে, রাশিয়া সম্প্রতি ভারত থেকে দুগ্ধ এবং সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানি করার জন্য যোগ্য ভারতীয় কোম্পানিগুলির তালিকা প্রসারিত করেছে। এটি ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতের উচ্চমানের সামুদ্রিক পণ্য, মূল্য সংযোজিত সামুদ্রিক খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিশ্বব্যাপী বিশাল চাহিদা রয়েছে। আমরা কোল্ড চেইন লজিস্টিকস, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং মাছ ধরার বন্দরের আধুনিকীকরণে যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারি। এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চাহিদাও পূরণ করবে এবং ভারতীয় পণ্যগুলিও নতুন বাজার পাবে। তৃতীয়তঃ, অটোমোবাইল ক্ষেত্র।ভারত আজ সাশ্রয়ী মূল্যের, দক্ষ ইভি(বৈদ্যুতিক যানবাহন), দু’চাকার যানবাহন এবং সিএনজি গতিশীলতা সমাধানের ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলির অন্যতম।রাশিয়াও বিভিন্ন উন্নত উপকরণের ক্ষেত্রে একটি প্রধান উৎপাদক দেশ। একসঙ্গে আমরা ইভি উৎপাদন, স্বয়ংচালিত উপাদান এবং মিলিতভাবে গতিশীল ট্যাগের অংশীদার হতে পারি। এটি কেবল আমাদের নিজস্ব চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে না বরং বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণ গোলার্ধ, বিশেষ করে আফ্রিকার উন্নয়নেও অবদান রাখবে। চতুর্থতঃ, ঔষধ উৎপাদন ক্ষেত্র, ভারত আজ বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের ওষুধ সরবরাহ করে। এই কারণেই ভারতকে বিশ্বের ফার্মেসিও বলা হয়।আমরা একসঙ্গে যৌথ ভ্যাকসিন উন্নয়ন, ক্যান্সার থেরাপি, রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস এবং এপিআই সরবরাহ শৃঙ্খলে সহযোগিতা করতে পারি। এটি স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা বৃদ্ধি করবে এবং নতুন নতুন শিল্প বিকাশ করবে। পঞ্চমতঃ, বস্ত্রশিল্প। প্রাকৃতিক তন্তু থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত টেক্সটাইল পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে ভারতের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। নকশা, হস্তশিল্প এবং কার্পেটে আমাদের বিশ্বব্যাপী উপস্থিতি রয়েছে। রাশিয়া পলিমার এবং সিন্থেটিক কাঁচামালের একটি প্রধান উৎপাদক। একসঙ্গে, আমরা একটি স্থিতিশীল টেক্সটাইল মূল্য শৃঙ্খল তৈরি করতে পারি। একইভাবে, সার, সিরামিক, সিমেন্ট উৎপাদন এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্ধুগণ,
সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে জনশক্তির গতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজ ভারত বিশ্বের দক্ষতার রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।আমাদের তরুণ প্রতিভার প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ এবং সরবরাহ সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা রয়েছে।রাশিয়ার জনসংখ্যাগত এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে, এই অংশীদারিত্ব উভয় দেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। ভারতীয় প্রতিভাদের রাশিয়ান ভাষা এবং সফট স্কিল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, আমরা যৌথভাবে রাশিয়া-প্রস্তুত কর্মীবাহিনী তৈরি করতে পারি যা উভয় দেশের ভাগ্য সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।

বন্ধুগণ,
আজ, আমরা আমাদের উভয় দেশের নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি আমাদের দুই দেশের মধ্যে পর্যটনকে আরও উন্নত করবে। এটি ট্যুর অপারেটরদের জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। বন্ধুগণ, আজ ভারত এবং রাশিয়া সহ-উদ্ভাবন, সহ-উৎপাদন এবং সহ-সৃষ্টির এক নতুন যাত্রা শুরু করছে। আমাদের লক্ষ্য পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা সমগ্র মানবজাতির মঙ্গল নিশ্চিত করতে চাই। এটি করার জন্য, আমাদের বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলির স্থায়ী সমাধান বিকাশ করতে হবে। ভারত এই যাত্রায় রাশিয়ার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। আমি আপনাদের সকলকে বলতে চাই, আসুন, ভারতে তৈরি করুন, ভারতের সঙ্গে অংশীদার হন, এবং আসুন, আমরা একসঙ্গে বিশ্বের জন্য তৈরি করি।এই কথাগুলি বলার মাধ্যমে, আমি রাষ্ট্রপতি পুতিন এবং আপনাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ।


